শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬

চাঁদরাতের শেষে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয় যাঁদের

প্রকাশিত: ০৬:৫৯, ২০ মার্চ ২০২৬ |

‎ঈদের সময় শপিং মলে সবচেয়ে বেশি কাজের চাপ বিক্রয়কর্মীদের ওপর পড়ে। পুরো রোজার মাসে প্রায় প্রতিদিনই তাঁদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। অনেকেরই আলাদা করে ঈদের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থাকে না। তবু হাসিমুখে ক্রেতাদের সেবা দিয়ে যান তাঁরা।

বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ ইমন এ পেশায় নতুন। পাঁচ মাস আগে সেলস অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ শুরু করেছেন সারা লাইফস্টাইলে। তিনি জানান, ২০ রোজা পর্যন্ত সপ্তাহে এক দিন ছুটি ছিল। ঈদ ঘনিয়ে আসায় এখন সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রেতা বাড়ার কারণে কাজের চাপও বেড়েছে। দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা ডিউটি করতে হচ্ছে। ইমন বলেন, ঈদকে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা থাকে, কিন্তু সব সময় তো আর সেগুলো পূরণ করা যায় না। তবু পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অপেক্ষায় আছেন তিনি।

চাঁদরাতে গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়ি যাওয়ার টিকিট করবেন। চার মাস পর বাড়ি যাচ্ছেন বলে ঈদটি তাঁর জন্য আরও বিশেষ। মা ও বড় বোনের জন্য উপহার কিনেছেন। বাড়ি গিয়ে ঈদের নামাজ পড়বেন এবং মায়ের হাতের রান্না খাবেন। এতেই তাঁর ঈদের আনন্দ। বন্ধুদের সঙ্গেও দেখা করার পরিকল্পনা আছে। তাঁদের জন্য ছোট ছোট উপহারও কিনে রেখেছেন। ঈদের সময় তিনি সাত দিনের ছুটি পাবেন বলে জানিয়েছেন।

হাসান ফুয়াদ
‎‎মিরপুরের হোপ মার্কেটে সাগর খানের শিশুদের পোশাকের ভ্রাম্যমাণ দোকান। ঈদে তাঁর জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময় চাঁদরাত। তিনি বলেন, চাঁদরাত প্রায়ই দোকানেই কেটে যায়। ক্রেতারা যখন বাচ্চাদের জন্য নতুন জামা কিনে আনন্দ করেন, সেই আনন্দ দেখেও ভালো লাগে। ঈদের আগের রাতে স্ত্রী ও সন্তানের জন্য ছোটখাটো উপহার নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তিনি জানান, স্ত্রীর জন্য মেহেদি আর চুড়ি কিনে নিয়ে যাবেন। ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়ে বিশ্রামের পর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবেন। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের সঙ্গে ছোট ছোট এই মুহূর্তগুলোই তাঁর কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

সরওয়ার
আফরোজা মোর্শেদ কে ক্র্যাফটের সিনিয়র সেলস এক্সিকিউটিভ। তিনি বলেন, ‘রোজার মাসে ৩০ দিনই আমাদের কাজ। চাঁদরাতে প্রায় রাত দেড়টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। এরপর ছুটি! অনেক সময় চাঁদরাতে কাজ শেষে ঈদের কেনাকাটা করতে হয়।’ ঈদের প্রস্তুতির জন্য তাঁদের আলাদা সময় থাকে না। তিনি জানান, রোজার সময় পরিবারের সঙ্গে খুব কম সময় কাটানো হয় তাঁর। বিশেষ করে দুই মেয়ে ফাবিহা ও সামিহার সঙ্গে সময় কম কাটানো হয় বলে মাঝেমধ্যে খারাপ লাগে। তবে কাজের দায়িত্বের কারণে সেটি মেনে নিতে হয়।

‎আফরোজার ঈদের দিনটাও অনেকটা ক্লান্তি নিয়ে কাটে। চাঁদরাতে বাসায় ফিরে ঈদের রান্নাবান্না করেন। স্বামী ঈদের নামাজ থেকে ফিরে এলে কিছুটা বিশ্রাম নেন। বিকেলের দিকে তাঁর মেয়েদের নিয়ে সময় কাটানো হয়। টানা কাজের পর শরীর খুব ক্লান্ত থাকে, তাই হয়তো ঈদের দিন কোথাও বেড়াতে না গিয়ে ঈদের পরের দিন যাবেন।

ক্লাব হাউসের বিক্রয়কর্মী তানজিনা আক্তার খিলগাঁওয়ে থাকেন। ঈদের সময় তাঁর কাজের ব্যস্ততা এতটাই বেশি থাকে যে চাঁদরাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে কখনো কখনো রাত তিনটা বেজে যায়। তিনি বলেন, ‘ক্রেতা যতক্ষণ দোকানে থাকেন, ততক্ষণ আমাদেরও থাকতে হয়। ফলে বাসায় ফিরে সবার মতো চাঁদরাতের মেহেদি দেওয়ার মতো সময়ও থাকে না। ঈদের দিনটি এখন তাঁর কাছে খুব আলাদা মনে হয় না।’ তিনি জানান, টানা কাজের ক্লান্তিতে ঈদের দিন প্রায় সারা দিনই ঘুমিয়ে কাটে। ঈদের সময় এখন আর আগের মতো আনন্দ লাগে না।

তানজিনা আক্তার বলেন, তাঁর মা অনেক আগে মারা গেছেন। গত বছর মারা গেছেন বাবাও। এখন তিনি একাই থাকেন। তাই ঈদ এলে পরিবারের অভাবটা আরও বেশি অনুভূত হয়। তবে কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই সেই কষ্ট কিছুটা ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। দোকানে সহকর্মীদের সঙ্গে খুনসুটি করেই অনেক সময় কাটে। তখন অন্য কষ্টগুলো খুব একটা মনে থাকে না। তবে সব সময় অভিজ্ঞতা সুখকরও হয় না। তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ক্রেতারা রেগে যান বা খারাপ ব্যবহার করেন। তবু কাজের দায়িত্বের কারণে সবকিছুই ধৈর্য ধরে সামলাতে হয়।

আড়ংয়ের বিক্রয় সহকারী মেহেদী হাসান জানান, ঈদের সময় চাঁদরাতে আউটলেট বন্ধ করতে করতে অনেক সময় ভোর হয়ে যায়। ফলে পরিবারের সঙ্গে চাঁদরাতের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, এ পেশায় কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ কিছুটা ত্যাগ করতে হয়। মেহেদীর বাড়ি বরিশালে। সেখানে তাঁর পরিবার থাকে। মা এখন তাঁর সঙ্গে ঢাকায় আছেন।

ঈদের সময় মাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করার পরিকল্পনা করেছেন। চাঁদরাতেই রওনা দেওয়ার ইচ্ছা আছে। মায়ের জন্য আড়ং থেকেই একটি শাড়ি কিনেছেন। তাঁর বোন, দুলাভাই ও সাত বছর বয়সী ভাগনে রাফসান খুলনায় থাকেন। বোন, দুলাভাইয়ের জন্য উপহার কিনেছেন। ভাগনের জন্য একটি ফতুয়া ও পাঞ্জাবি কিনে রেখেছেন। সুযোগ পেলে ভাগনের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। সবকিছুর মধ্যে পরিবারের সঙ্গে ঈদের সময়টুকু কাটানোর চেষ্টা করেন।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor