শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬

‘সাভারের জমিদার’ আজিজের শত বিঘা জমির হিসাব বেরিয়ে এলো

প্রকাশিত: ১২:৪৬, ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৫

সাভারে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের প্রায় শত বিঘা জমি, বাংলোবাড়ি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদের সন্ধান পাওয়ার দাবি উঠেছে। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠজনদের নামেও এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি করেছে স্থানীয়রা। সাভারের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব সম্পত্তির মালিকানা ও দখল নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। সম্প্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির উদ্যোগের খবরের মধ্যেই তার বিপুল সম্পদের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অন্যতম আসামি সাবেক জেনারেল আজিজ আহমেদ। সোমবার তাকে ওই মামলায় ‘রেড নোটিশ’ জারির জন্য ইন্টারপোলের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে দেশজুড়ে তাকে নিয়ে চলেছে আলোচনা-সমালোচনা।

শীর্ষ সন্ত্রাসী ভাইদের বাঁচাতে তার ভূমিকা ছিল অভাবনীয়। সন্ত্রাসী ভাইদের ফাঁসি থেকে বাঁচানো, ব্যবসায়িক সহায়তা, অনৈতিক সুবিধা, সন্ত্রাসীর তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ গায়েব, নাম পরিবর্তন, ভুয়া এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা, ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি, গাড়ি, হোটেল-রিসোর্ট এমনকি বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনে ভাইদের সহায়তা করেছেন একসময়ের এই দাপুটে জেনারেল। নিজেও রিসোর্ট, বাংলোবাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, শত বিঘা জমি কিনে তেলেসমাতি দেখিয়েছেন। তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনেছেন। সাভারের আনাচে-কানাচেই কিনেছেন শতাধিক বিঘা জমি। তাই তাকে ‘সাভারের জমিদার’ বলা হতো। সাভারে আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে বিপুল সম্পদ। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাভারের তুরাগ নদঘেঁষা আমিনবাজার বড় বরদেশী মৌজায় সিলিকন সিটি হাউজিংয়ে আরএস ১৩০৩নং দাগে ৭৫ কাঠা, ১৩১১নং দাগে ৩০.৬ কাঠা, ১৭৬১ দাগে ৮০ কাঠা জমি রয়েছে আজিজ আহমেদের। ওই জমিতে তার একটি বাংলোবাড়ি আছে। উঁচু দেওয়ালঘেরা বাড়িতে আছে হরেকরকম গাছ। পশুপাখিও পালন করা হতো। আগে সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন আনসার সদস্যরা। এখন কয়েকজন রাখাল রয়েছে। মাঝেমধ্যেই স্কুল-কলেজের বন্ধুদের নিয়ে এই বাড়িতে আড্ডা দিতেন আজিজ। বর্তমানে হাইকোর্টের নির্দেশে সিলিকন সিটির সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সিলিকন সিটিতে আজিজের ছোট ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফের নামে প্রায় ২০০ কাঠা জমি আছে। অভিযোগ রয়েছে, জেনারেল আজিজ সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় সিলিকন সিটি হাউজিংয়ের এমডি সরোয়ার খালেদকে জমি দখলে সহায়তা করায় আজিজ ও তার পরিবারকে এই সম্পত্তি উপহার হিসাবে দেওয়া হয়। সিলিকনের ম্যাপেও আজিজ পরিবারের সম্পত্তির নির্দেশিকা দেখা গেছে।

এছাড়া আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের মনোসন্তোষপুর মৌজায় পূর্ণিমারচালা এলাকায় আরএস ১৭১ ও ১৭২নং দাগে আজিজ আহমেদের প্রায় ২১ বিঘা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে স্থানীয় ঈমান আলী, আব্বাস উদ্দিন, খোরশেদ আলম ও ফারুকের মাধ্যমে এই জমি কেনেন আজিজ আহমেদ। ১৭১ দাগের জমিতে উঁচু প্রাচীরঘেরা একটি বাংলোবাড়ি আছে। পাশের ১৭২ দাগে ইটের রাস্তার পাশে প্রায় ৫ বিঘা জমি বাউন্ডারি করা আছে। ভেতরে ছোট্ট একটি ঘরে আজিজ আহমেদের বাসা দেখাশোনা করা সাবেক সৈনিক মাইন উদ্দিন সুমন তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তিনি চার বছর ধরে এই সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে আছেন।

সরেজমিন গিয়ে আজিজ আহমেদের জমির নিরাপত্তারক্ষী মাইন উদ্দিন সুমনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, রিটায়ারমেন্টের পর আমি এখানে চলে এসেছি। এই জমির মালিক কে জানি না। ফারুক নামে একজন আমাকে এখানে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি দায়িত্ব পালন করছি। আমার কাজ শুধু দেখাশোনা করা।

স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, আজিজ আহমেদ সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় প্রায়ই এই জমি দেখতে আসতেন। আশুলিয়ার জিরাবোর ফারুক হোসেন তাকে এই জমি কিনে দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর গাড়ি নিয়েই জেনারেল আজিজ এখানে আসতেন। তার ভাই জোসেফ ২ থেকে ৩ মাস পরপর সেখানে যেতেন। জমি দেখে আবার চলে যেতেন। শুনেছি আজিজ আহমেদ জমিগুলো ফারুক হোসেনের নামেই কিনেছেন। পরে তার কাছ থেকে পাওয়ার নিয়ে রেখেছেন।

এছাড়া আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের মনোসন্তোষপুর মৌজায় ৫০ বিঘার ওপরে জমি আছে। এলাকাবাসী জানান, ফারুকের যত জমি সবগুলোই আজিজ আহমেদের। ভাকুর্তা ইউনিয়নের বাহেরচর এলাকায় শ্যামলাপুর মৌজায় আজিজ আহমেদের নামে বেশকিছু প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শ্যামলাসি কলাতিয়াপাড়ার পেছনে জমজম হাউজিংয়ের রাস্তার ডানপাশে ৮০ শতাংশের প্লট, এর একটু দূরেই ৫০ শতাংশের আরেকটি প্লট আছে আজিজ আহমেদের। শ্যামলাসি দুদু মার্কেট এলাকায় অ্যাকটিভ প্রিক্যাডেট স্কুলের পাশে ১৭ শতাংশের একটি প্লট রয়েছে তার। ভাকুর্তা ইউনিয়নের শ্যামলাপুর মৌজার বাহেরচর ও লুটেরচর এলাকায় আজিজের সহায়তায় বিপুল পরিমাণ জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বড় ভাই আনিস আহমেদের ছেলে আসিফ আহমেদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় এসি (ল্যান্ড) অফিস থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সিএস ৩৪৩ ও ৩৪৪, আরএস ২৫০২ দাগে ৭৮ শতাংশ জমি। জমিটি আগে সেজান জুসের মালিকানায় থাকলেও এখন তা আজিজ আহমেদের মালিকানায়।

এছাড়া সাভারের শ্যামলাপুর মৌজায় আরএস ২৬৬৪ দাগে ৯৮ শতাংশ জমি আছে। জমিটি আগে ছিল লুটেরচর বড় মসজিদ ও বছিলা মসজিদের। এই জমিতে ৩৮টি প্লট তৈরি করে চারদিকে প্রাচীর দিয়ে রাখা হয়েছে। পাশের প্লটেই এসএ ৮২৫, আরএস ২৫০০ ও ২৫০১ দাগে আজিজ আহমেদের বোনজামাই নুরুল ইসলামের ৩৯ শতাংশ জমি রয়েছে। এই জমির মালিক ছিলেন খোরশেদ আলম। পুরো জায়গাটি ইটের প্রাচীর তৈরি করে জিনি পাওয়ার টেকনোলজি লিমিটেডের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। চরওয়াশপুরে আসিফের নামে ৫২ শতাংশ জমি আছে। শ্যামলাসি স্কুলের পাশে রাস্তা থেকে নেমে আরএস ২৮৮৬ দাগে ৫ কাঠা জমিতে আজিজ আহমেদের একটি একতলা বাড়ি আছে। ওই বাড়িটি তিনি তার বোনকে লিখে দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে উল্লেখিত অভিযুক্তরা সবাই বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় কারও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor