বাংলাদেশের পথের ধারের যৌনকর্মীদের অধিকাংশ স্বেচ্ছায় নয়; বরং শৈশবে নির্যাতন, পারিবারিক ভাঙন, চরম দারিদ্র্য ও সহিংসতার কারণে এই পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৩ শতাংশ নারী যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই গুরুতর যৌন বা শারীরিক সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘কালচার অ্যান্ড সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড রিডেম্পশন: প্রিভেনশন, প্রটেকশন অ্যান্ড ন্যারেটিভ আইডেন্টিটি কনস্ট্রাকশন এমং বাংলাদেশি স্ট্রিট বেজড ফিমেল সেক্স ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাইন্ডওয়েল রিসার্চ ল্যাব’-এর অধীনে গবেষণাটি পরিচালনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের একদল গবেষক।
গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলের ৩০ জন পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীর জীবন কাহিনি ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। গবেষকরা তাদের ১০৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে ছয়টি প্রধান থিম চিহ্নিত করেন। সেগুলো হলো—ট্রমা ও নিপীড়ন, মাতৃত্ব, টিকে থাকার সংগ্রাম, সামাজিক সহায়তা, ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্ক।
ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ৬ নারী অপরাধী
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত সমাজ বাস্তবতায় তাদের টিকে থাকার লড়াইটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত চেষ্টা নয়; বরং মাতৃত্বের টান, সহকর্মীদের পারস্পরিক সংহতি এবং এনজিওভিত্তিক সহায়তা মিলে একটি ‘যৌথ মনস্তাত্ত্বিক শক্তি’ তাদের জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার রসদ জুগিয়েছে। শৈশবের আঘাতই মূল কারণ: গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সব নারীই শৈশবে চরম দারিদ্র্য ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৭ শতাংশকে অল্প বয়সে বাধ্য হয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে এবং ৯৩ শতাংশ নারী যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই গুরুতর যৌন বা শারীরিক সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। একজন অংশগ্রহণকারী গবেষকদের বলেন, ‘আমি যখন মাত্র ১০ বছরের, তখন তিনজন বড় মানুষ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমার প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, কিন্তু কেউ সাহায্য করেনি।’
এই ১০ উচ্চ বেতনের পেশায় নারীদের প্রাধান্য বেশি
আরেকজন বলেন, কাজের খোঁজে ঢাকা এসে প্রতারণার শিকার হন, তাকে জোরপূর্বক যৌন পেশায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
গবেষকদের ভাষ্য, এসব অভিজ্ঞতা তাদের জীবনের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। যৌন পেশা তাদের জন্য ‘পছন্দের’ কাজ নয়, বরং বারবার নিপীড়নের পর টিকে থাকার একমাত্র কৌশল।
ট্রমা স্মৃতিকেও করে দিয়েছে ঝাপসা: শৈশবের ট্রমা এই নারীদের স্মৃতিকেও প্রভাবিত করেছে। গবেষকরা দেখেছেন, অংশগ্রহণকারীরা তাদের জীবনের ‘মোড় পরিবর্তনকারী’ ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন না। সেসব স্মৃতি অস্পষ্ট, ঢালাও ও বিচ্ছিন্ন। ‘মোড় পরিবর্তনকারী’ মোট স্মৃতির ৮৫ শতাংশই ছিল এই ধরনের ‘অতিসাধারণীকৃত’ স্মৃতি। মনোবিজ্ঞানের তত্ত্ব বলে, গুরুতর ট্রমা মানুষের স্মৃতি সংগঠনকে ভেঙে দেয়। ফলে ঘটনাগুলো একটি সুসংহত জীবন কাহিনি হিসেবে মনে থাকে না, বরং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে।
লড়াইটি একার নয়, সমষ্টির: মনোবিজ্ঞানের প্রচলিত পশ্চিমা তত্ত্বে ধরে নেওয়া হয় যে, মানুষ তার জীবনের অর্থ ও পরিচয় একাকী, ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পুনর্গঠন করে। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের মতো সমাজে সেই প্রক্রিয়া মূলত সামষ্টিক। মাতৃত্ব অনেক নারীর বেঁচে থাকার নতুন অর্থ তৈরি করেছে। ২৭ জন মায়ের প্রায় সবাই সন্তানকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকার তীব্র প্রেরণা পেয়েছেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে, যদিও একই সঙ্গে কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগে থাকেন। পাশাপাশি, সহকর্মীদের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতাও তাদের অন্যতম বড় মানসিক শক্তি। প্রায় ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, এনজিও পরিচালিত বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কর্মসূচি তাদের নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে।
মাতৃত্ব, সহকর্মীদের সংহতি ও এনজিওর সহায়তা একসঙ্গে মিলে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন এসব নারীর পরিচয় পুনর্নির্মাণ করে। গবেষকরা এটিকে বলছেন ‘সমষ্টিগত মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচ’, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক মডেলের চেয়ে অনেক বেশি প্রযোজ্য।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তীব্র আত্মগ্লানি: সহায়তা সত্ত্বেও তীব্র সামাজিক কলঙ্ক এবং এর ফলে তৈরি হওয়া আত্মগ্লানি এখনো তাদের জীবনের বড় বাস্তবতা। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা নিজেদের পেশা নিয়ে তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগেন। সমাজে আসল পরিচয় প্রকাশ পেলে অপমানিত হওয়া, বাসা ভাড়া না পাওয়া কিংবা সন্তানের শিক্ষাজীবনে বাধা আসার মতো গভীর সংকটের মধ্যে তারা প্রতিনিয়ত দিন কাটান।
প্রতিরোধ ও সুরক্ষার সুপারিশ: গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, যৌন পেশায় প্রবেশের মূল কারণ হিসেবে শৈশবের নির্যাতন ও দারিদ্র্যকে বিবেচনায় নিয়ে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. ঝুঁকিতে থাকা মেয়েশিশুদের জন্য শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
২. গৃহহীন কিশোরীদের জন্য শোষণ ঘটার আগেই নিরাপদ আশ্রয় ও অর্থনৈতিক সহায়তা।
৩. অতিদারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা।
৪. পথে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ট্রমা-সচেতন সেবা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা।
গবেষক ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০ জনের মধ্যে একজনও স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসেননি। সবার ক্ষেত্রেই শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, ঘরছাড়া হওয়া এবং সহিংসতা—এই চারটি উপাদান মিলিয়ে একটি সাধারণ পথ তৈরি হয়েছে। এটি আমাদের বলছে, সমস্যাটি ব্যক্তির ‘চরিত্রের’ নয়, কাঠামোর।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ, যা সমস্যা তৈরি হওয়ার পরে নয়, তৈরি হওয়ার আগেই গ্রহণ করতে হবে।
Publisher & Editor