উৎসব মানেই পরিবার, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া আর আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। কিন্তু পড়াশোনা, চাকরি কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে যাঁদের বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হয়, তাঁদের কাছে উৎসবের সময়টা অনেক সময় আনন্দের বদলে একাকিত্ব ও মন খারাপের কারণ হয়ে ওঠে।
চারপাশে সবাইকে উৎসব উদ্যাপন করতে দেখেও নিজের মধ্যে শূন্যতা অনুভব করতে পারেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময় পরিবারের অভাববোধ মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর লাইফস্টাইল বিভাগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হামজা হুসাইন এ বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
উৎসবের সময় কেন বাড়ির কথা বেশি মনে পড়ে?
উৎসবের সঙ্গে পরিবারের স্মৃতি, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং দীর্ঘদিনের নানা অভ্যাস জড়িয়ে থাকে।
ফলে এ সময় বাড়ি থেকে দূরে থাকলে প্রিয়জনদের অনুপস্থিতি আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হামজা হুসাইনের মতে, উৎসবের সময় মানুষ যেমন আনন্দিত থাকার প্রত্যাশা করেন, বাস্তবে নিজের অনুভূতি তার সঙ্গে না মিললে একাকিত্ব আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কর্মজীবী তরুণ, অভিবাসী এবং পরিবারের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা দেখা যেতে পারে।
চারপাশে আনন্দ, তবু মন খারাপ
একাকিত্ব মানেই যে একজন মানুষ শারীরিকভাবে একা থাকবেন, তা নয়।
বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েও কেউ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন। যখন কাছের মানুষদের সঙ্গে আবেগের সংযোগ কম অনুভূত হয়, তখন আশপাশে লোকজন থাকলেও একাকিত্ব তৈরি হতে পারে।
উৎসবের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের পারিবারিক আয়োজন, ছবি ও ভিডিও দেখেও মন খারাপ হতে পারে। মনে হতে পারে, সবাই আনন্দে আছেন, শুধু তিনিই সেই আনন্দ থেকে দূরে। এর ফলে বাড়ির জন্য মন কাঁদা, বিষণ্নতা, বিরক্তি কিংবা নিজেকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হওয়ার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
তবে উৎসবের সময় মন খারাপ হলেই সেটিকে মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং ঘুম, খাওয়াদাওয়া, মনোযোগ, কাজের আগ্রহ কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে শুরু করলে।
একাকিত্ব কাটাতে কী করবেন?
উৎসবের সময় বাড়ি থেকে দূরে থাকলেও প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি অভ্যাস সহায়ক হতে পারে।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান: সুবিধামতো ভিডিও কল করুন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উৎসবের স্মৃতি ভাগ করে নিন কিংবা একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মতো ছোট আয়োজন করতে পারেন।
বন্ধুদের সঙ্গে উৎসব উদ্যাপন করুন: কাছের বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া কিংবা ছোট কোনো আয়োজন করতে পারেন। এতে নতুন পরিবেশেও আপনজনের সঙ্গে থাকার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
নিজের মতো করে উৎসব পালন করুন: পরিবারের সঙ্গে থাকতে না পারলেও পছন্দের খাবার তৈরি করা, গান শোনা কিংবা পরিচিত কোনো রীতি অনুসরণ করার মাধ্যমে দিনটিকে বিশেষ করে তুলতে পারেন।
নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন: উৎসব বলে সব সময় আনন্দিত থাকতে হবে, এমন চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়ির জন্য মন খারাপ হলে সেই অনুভূতিকে অস্বীকার না করে নিজের মতো করে সময় দিন।
কখন বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন?
উৎসবের সময় সাময়িক মন খারাপ বা একাকিত্ব অস্বাভাবিক নয়। তবে এই অনুভূতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে, ঘুম ও খাওয়াদাওয়ায় পরিবর্তন এলে কিংবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হামজা হুসাইনের মতে, লক্ষ্য একাকিত্বের অনুভূতি পুরোপুরি দূর করা নয়; বরং সেটিকে স্বীকার করা, প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং যেখানে আছেন, সেখানেই অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করা।
পরিবার থেকে দূরে থাকা মানেই আপনজনদের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। উৎসবের আনন্দ সবার জন্য একই রকম নাও হতে পারে। তাই নিজের অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা এবং প্রয়োজনের সময় অন্যের সাহায্য নেওয়াই হতে পারে মানসিকভাবে ভালো থাকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
Publisher & Editor