বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কর ফাঁকি নাকি বাজার হারানোর ভয়

প্রকাশিত: ০৬:৫৯, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫

একটি সিনেমায় নায়ক কত টাকা নেন? নায়িকার পারিশ্রমিকই বা কত? জনপ্রিয় নাট্যতারকার একদিনের শুটিংয়ের দাম কত? প্রশ্নগুলো দর্শকের কাছে কৌতূহলের, প্রযোজকের কাছে হিসাবের, আর তারকার কাছে যেন গোপনীয়তার। বাংলাদেশের বিনোদন জগতে পারিশ্রমিক নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা থাকলেও নির্দিষ্ট অঙ্ক বলতে অনাগ্রহী অধিকাংশ তারকা। সংবাদমাধ্যমে মাঝেমধ্যে পারিশ্রমিকের যে হিসাব আসে, সেগুলোও সাধারণত প্রযোজক-পরিচালক বা সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যনির্ভর।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে ঢালিউডের নায়ক-নায়িকাদের পারিশ্রমিকে লাখ থেকে কোটি টাকার ব্যবধানের চিত্র উঠে এসেছে। নাটকের ক্ষেত্রেও শীর্ষ তারকাদের পারিশ্রমিক কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। কিন্তু তারকারা নিজের মুখে সেই অঙ্ক কখনোই স্বীকার করতে চান না।

তাহলে প্রশ্ন-এত গোপনীয়তার কারণ কী? নিজের বাজারমূল্য কমে যাওয়ার ভয়, সহকর্মীদের সঙ্গে তুলনা এড়ানো, নাকি আয়কর কর্তৃপক্ষের নজর এড়ানোর চেষ্টা?

* ‘অঙ্কটা প্রকাশ করলে বেঞ্চমার্ক হয়ে যায়’

পারিশ্রমিক গোপন রাখার সবচেয়ে বড় যুক্তি পাওয়া যায় বাজারের দর-কষাকষিতে। প্রযোজকরা মনে করেন, একজন তারকার পারিশ্রমিক প্রকাশ্যে এলে সেটিই পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি বা ‘বেঞ্চমার্ক’ হয়ে যায়। ফলে তারকা নিজের দর নিয়ে ভবিষ্যতে আর নমনীয়ভাবে আলোচনা করতে পারেন না।

শাকিব খানের সাম্প্রতিক পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনাতেও একই যুক্তি উঠে এসেছে। তার একটি সিনেমার প্রযোজক স্পষ্ট করে বলেছেন, তারকার পারিশ্রমিক প্রকাশ করলে একটি ‘বেঞ্চমার্ক’ তৈরি হয়; বাজেট ও তারকার বাজার অনুযায়ী পারিশ্রমিক ভিন্ন হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা তাই এটিকে গোপন রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

অর্থাৎ গোপনীয়তার একটি অংশ নিছক ব্যবসায়িক কৌশল। একই অভিনেতা এক সিনেমায় বেশি, অন্য সিনেমায় কম-এমনটা হতে পারে। প্রযোজকের সঙ্গে সম্পর্ক, সিনেমার বাজেট, চরিত্র, শুটিংয়ের সময়, তারকার বাজারমূল্য-সবকিছু মিলিয়েই চুক্তির অঙ্ক নির্ধারিত হয়।

* নাটকের তারকারাও কি অঙ্ক বলতে চান না

নাটকের শিল্পীদের বক্তব্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তাদের যুক্তি-এখন অনেকেই আগের চেয়ে কম কাজ করেন, কিন্তু একটি কাজের পেছনে বেশি সময় দেন। ফলে পারিশ্রমিক বাড়লেও সেটিকে শুধু ‘দর বাড়ানো’ হিসাবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কারও কারও ক্ষেত্রে নাটকের ভিউ ও দর্শকচাহিদাও পারিশ্রমিক নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব যেমন পারিশ্রমিক বাড়ানোর বিষয়ে বলেছেন, তিনি যৌক্তিক জায়গা থেকেই তা বাড়িয়েছেন; তবে ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনে ছাড় দেওয়ার মানসিকতাও তার রয়েছে। অর্থাৎ তারকাদের কাছে পারিশ্রমিক শুধু অর্থের অঙ্ক নয়-এটি তাদের সময়, জনপ্রিয়তা ও বাজারমূল্যেরও প্রতিফলন।

* গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ভয়ও কি আছে

এটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একজন শিল্পী যদি জানান তিনি একটি নাটকে পাঁচ লাখ টাকা নিচ্ছেন, পরেরবার কোনো প্রযোজক তাকে তিন লাখ দিতে চাইলে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার একই সময়ে অন্য শিল্পী কম বা বেশি পারিশ্রমিক নিলে শুরু হয় তুলনা।

বিশেষ করে নারী ও পুরুষ শিল্পীদের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক প্রকাশ পেলে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নায়ক ও নায়িকাদের পারিশ্রমিকের আলাদা চিত্র পাওয়া যায়। তবে বাস্তবে কার কত-এ নিয়ে নির্ভরযোগ্য চুক্তিভিত্তিক তথ্যের অভাব রয়েছে।

আর তারকার জনপ্রিয়তা সব সময় পারিশ্রমিকের সঙ্গে সরলরেখায় চলে না। কেউ বেশি পারিশ্রমিক নিয়েও ব্যর্থ হতে পারেন, আবার কম পারিশ্রমিকে কাজ করা কোনো শিল্পীর সিনেমা বা নাটক দর্শকপ্রিয় হতে পারে। ফলে অঙ্ক প্রকাশের সঙ্গে তারকার ‘দাম’ ও জনপ্রিয়তাকে এক করে দেখার ঝুঁকি রয়েছে।

* তবে কর ফাঁকির প্রশ্নটি কোথায়

এখানেই বিষয়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। আয় গোপন করার উদ্দেশ্যে কেউ পারিশ্রমিকের প্রকৃত অঙ্ক প্রকাশ না করলে সেটি কর ফাঁকির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে-কিন্তু পারিশ্রমিক প্রকাশ না করলেই যে কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে আয়কর কাঠামোয় শিল্পীর আয় করের আওতায় আসতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়মিত আয়কর পরিপত্র ও উৎসে করসংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশ করে। অর্থাৎ একজন তারকা সংবাদমাধ্যমকে পারিশ্রমিক না জানালেও তার আয় যদি যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত ও করযোগ্য আয় হিসাবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে সেটি কর ফাঁকি নয়। বিপরীতে চুক্তিতে এক অঙ্ক দেখিয়ে প্রকৃতপক্ষে অন্য অঙ্ক গ্রহণ করা হলে বিষয়টি কর-স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

সমস্যা হলো, বাংলাদেশের বিনোদন খাতে পারিশ্রমিকের প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য ডেটাবেস নেই। ফলে সংবাদমাধ্যমে যে অঙ্কগুলো প্রকাশ হয়, তার অনেকটাই সূত্রনির্ভর। এমনকি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও ‘প্রযোজক-পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র’ থেকে পারিশ্রমিকের হিসাব নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

* প্রযোজকদের অভিযোগও কম নয়

পারিশ্রমিকের গোপনীয়তার আরেকটি দিক হলো প্রযোজকদের সঙ্গে দর-কষাকষি। নাটকের বাজারে প্রযোজকদের অভিযোগ, কোনো কোনো শীর্ষ তারকার পারিশ্রমিক একটি নাটকের মোট বাজেটের বড় অংশ নিয়ে নেয়। সম্প্রতি ৩ থেকে ৭ লাখ টাকার নাটকের বাজেটের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত একজন শিল্পীর পারিশ্রমিকে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।

অন্যদিকে প্রযোজকদেরই আরেক অংশ বলছে, তারকাদের জনপ্রিয়তা ছাড়া অনেক নাটক বা সিনেমা বাজারে বিক্রি করাও কঠিন। অর্থাৎ তারকার পারিশ্রমিক যেমন ব্যয়ের বড় জায়গা, তেমনি তিনিই অনেক সময় বিনিয়োগ ফেরানোর প্রধান ‘ব্র্যান্ড’।

এই দ্বন্দ্বই আসলে পারিশ্রমিকের বাজারকে অস্বচ্ছ রাখছে।

* স্বচ্ছতা কোথায়

বিনোদন সাংবাদিক ও শিল্প-সংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট-সমস্যা শুধু তারকার অঙ্ক প্রকাশ না করার মধ্যে নয়; বরং চুক্তি, আয়, কর, প্রযোজনা ব্যয় ও রাজস্বের পুরো ব্যবস্থাটির স্বচ্ছতার অভাবেই বড় সমস্যা।

শিল্পীরা নিজের পারিশ্রমিক প্রকাশ করতে বাধ্য নন। ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য প্রকাশ করা তাদের অধিকারও নয়। কিন্তু শিল্পে যদি একটি স্বচ্ছ কাঠামো থাকে-চুক্তিতে প্রকৃত পারিশ্রমিক, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন, যথাযথ উৎসে কর কর্তন এবং কর রিটার্নে সঠিক আয় প্রদর্শন-এসব থাকে, তাহলে সংবাদমাধ্যমে অঙ্ক প্রকাশ না করলেও রাষ্ট্রের কাছে আয় গোপন থাকার কথা নয়।

অন্যদিকে শিল্পীদের আরেকটি বাস্তব সমস্যাও রয়েছে-পারিশ্রমিক পাওয়াই যেখানে অনেক সময় অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালক, অভিনেতা ও কলাকুশলীদের পাওনা না পাওয়ার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে; এমনকি কাজ হারানোর আশঙ্কায় অনেকে নাম প্রকাশ করতেও ভয় পান।

তাই বাংলাদেশের তারকারা পারিশ্রমিকের অঙ্ক প্রকাশ করেন না-এর একমাত্র উত্তর ‘কর ফাঁকি’ নয়। এর পেছনে আছে বাজারমূল্য ধরে রাখার কৌশল, দর-কষাকষির সুবিধা, সহকর্মীদের সঙ্গে তুলনা এড়ানো, নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে ভুল বার্তা না দেওয়ার চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য গোপন রাখার অধিকার।

তবে একইসঙ্গে এটিও সত্য-গোপনীয়তার আড়ালে যদি প্রকৃত আয় কম দেখানো হয়, তাহলে সেটি শুধু তারকার ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না; রাষ্ট্রের রাজস্ব ও শিল্পের আর্থিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে অনেক তারকাশিল্পীই এ পথের অনুসারী।

সুতরাং প্রশ্নটা হওয়া উচিত শুধু-‘নায়ক কত নেন?’ নয়। বরং আরও জাংরি প্রশ্ন-‘যে অঙ্কেই নিন, সেই অর্থের হিসাব কি স্বচ্ছ?’

কারণ তারকার পারিশ্রমিক গোপন থাকা অপরাধ নয়; কিন্তু প্রকৃত আয় গোপন করা হলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বড় অনিয়ম।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor