ইউরোপের অন্যতম প্রধান ফ্যাশনকেন্দ্র প্যারিসে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকের বড় আয়োজন ‘টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিস—শরৎ ২০২৬’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা, ব্র্যান্ড ও সরবরাহকারীদের এ মিলনমেলায় এবার বাংলাদেশের ১৭টি প্রতিষ্ঠান নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরছে।
এর মধ্যে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) উদ্যোগে অংশ নিয়েছে ১২টি এবং নিজস্ব উদ্যোগে আরো পাঁচটি প্রতিষ্ঠান।
সোমবার প্যারিস-লে বুর্জে প্রদর্শনী কেন্দ্রে শুরু হওয়া তিন দিনের এ মেলায় একই দিন উদ্বোধন করা হয় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। হল-৩-এর বি-৩৩০ নম্বর বুথে প্যাভিলিয়নের উদ্বোধন করেন ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি খন্দকার এম. তালহা।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ।
এসময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও প্যাভিলিয়ন পরিচালক মোহাম্মদ রেহান উদ্দিন এবং ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
৩১ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্যারিসের পার্ক দেজ এক্সপোজিসিয়োঁ দ্য প্যারিস-লে বুর্জের ২, ৩ ও ৪ নম্বর হলে চলছে মেলাটি। আয়োজক মেসে ফ্রাঙ্কফুর্টের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ৫৯তম আসরে প্রায় ৩৫টি দেশের ১ হাজার ৩০০ নির্মাতা ও সরবরাহকারী অংশ নিয়েছে।
টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিস আন্তর্জাতিক ক্রেতা, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, আমদানিকারক ও পোশাক-টেক্সটাইল সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম।
টেক্সওয়ার্ল্ড প্যারিস অংশে বিভিন্ন ধরনের কাপড় ও টেক্সটাইল উপকরণ এবং অ্যাপারেল সোর্সিং অংশে তৈরি পোশাক ও ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি টেকসই ও প্রযুক্তিনির্ভর ফ্যাশনের নতুন সমাধান নিয়ে রয়েছে অ্যাভানটেক্স প্যারিস। বিশ্ব পোশাকবাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য, দ্রুত ডেলিভারি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং কাঁচামালের উৎসের স্বচ্ছতা ক্রেতাদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে প্রচলিত উৎপাদনকারী দেশের পাশাপাশি নতুন সোর্সিং গন্তব্যের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। মেলায় চীন, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশের পাশাপাশি ইউরোমেড অঞ্চল, আর্মেনিয়া, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও বুলগেরিয়াও অংশ নিয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশ। তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ায় এখন শুধু উৎপাদন সক্ষমতা নয়, পণ্যের মান, বৈচিত্র্য, দ্রুত সরবরাহ, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনও ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
প্যারিসের এ মেলায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা সরাসরি ইউরোপীয় ক্রেতা, ব্র্যান্ড ও আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরির পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও বেশি মূল্য সংযোজনকারী পোশাকপণ্যের সক্ষমতাও তুলে ধরছেন তাঁরা।
প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) মিজানুর রহমান জানান, ইপিবির উদ্যোগে ১২টি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে আরও পাঁচটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। প্রদর্শক তালিকায় বাংলাদেশের বেঙ্গল গ্লোরি লিমিটেডও রয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন নিটওয়্যার, ডেনিম, স্পোর্টসওয়্যার ও আউটারওয়্যারসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি টেকসই উৎপাদন, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ বাড়ছে।
এবারের মেলায় টেকসই ফ্যাশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক ও পুনর্ব্যবহৃত ফাইবার, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করতে রয়েছে ‘ইকোনজি ফাইন্ডার’ উদ্যোগ।
অ্যাভানটেক্স প্যারিসে স্মার্ট ম্যাটেরিয়াল, সার্কুলার সমাধান, অটোমেশন ও গবেষণা-উন্নয়নের পাশাপাশি উৎপাদন ও বাজার বিশ্লেষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তুলে ধরা হচ্ছে।
এ ছাড়া চামড়া ও জুয়েলারি পণ্যের জন্য বিশেষ প্যাভিলিয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাপড়, অ্যাকটিভওয়্যার ও স্পোর্টসওয়্যারের জন্য নতুন আউটডোর এলাকা রয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
মেলায় শরৎ-শীত ২০২৭-২০২৮ মৌসুমের সম্ভাব্য ফ্যাশন ট্রেন্ড নিয়ে ‘অটপসি’ নামে নতুন ট্রেন্ড বুক উপস্থাপন করা হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি ব্র্যান্ডের জন্য অল্প পরিমাণে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেতে রয়েছে ‘স্মল কোয়ান্টিটি ইটিনেরারি’।
এদিকে ইউরোপের কাছাকাছি উৎপাদন উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহের প্রবণতাও বাড়ছে। এ কারণে তুরস্ক, সার্বিয়া, রোমানিয়া ও পর্তুগালের প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে মেলায় তৈরি হয়েছে বিশেষ ‘নিয়ার সোর্সিং হাব’।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। তাই পণ্যের বৈচিত্র্য ও মান বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষতা, টেকসই উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের পোশাকে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
প্যারিসের টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তাই শুধু পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ নয়; ইউরোপের ক্রেতাদের সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি এবং দেশের পোশাক রপ্তানি আরও সম্প্রসারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
Publisher & Editor