কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে মানুষকে বোঝার জন্য ধর্মীয় পরিচয় কখনো প্রধান হয়ে ওঠেনি। মানুষের দুঃখ, অপমান, প্রেম, বিদ্রোহ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতার কেন্দ্রে এমন প্রবলভাবে উপস্থিত যে সেখানে হিন্দু কিংবা মুসলমান পরিচয়ের আগে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মানুষ।
অথচ যে সময়ে তাঁর সাহিত্যিক আবির্ভাব, ভারতবর্ষ তখন ধর্মীয় বিভাজনের উত্তাপ বহন করছে। ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের অবনতি এবং পৃথক জাতিসত্তার ধারণা ক্রমে জনজীবনে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে নজরুল লিখেছেন মিলনের কথা, একই কবিতায় পাশাপাশি বসাচ্ছেন কোরআন ও পুরাণের অনুষঙ্গ। তাঁর কণ্ঠে শ্যামাসংগীতের সুর যেমন উঠছে, তেমনি হামদ, নাত ও ইসলামী সংগীতও।
এই বহুস্বরের ভেতরেই নজরুলকে খুঁজতে হয়। নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতা কোনো দূরবর্তী তত্ত্ব থেকে আসেনি। তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার গভীর যোগ ছিল। শৈশবে মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, মক্তবে পড়েছেন, লেটোর দলে গান ও পালা লিখতে গিয়ে হিন্দু পুরাণের বিশাল জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।
ইসলামী সংস্কৃতি এবং হিন্দু পুরাণ তাঁর কল্পনার দুই পৃথক কক্ষ হয়ে থাকেনি। একটির পাশে আরেকটি এসেছে সহজ আত্মীয়তায়। ফলে তাঁর কবিতায় আল্লাহ, রাসুল, কারবালা, ইমাম হোসেন যেমন আসেন; তেমনি আসেন শিব, কালী, কৃষ্ণ, অর্জুন, ভীম, চণ্ডী। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার দিকে তাকালেই এই মিলনের বিস্ময়কর রূপ চোখে পড়ে। সেখানে তিনি কখনো ‘নটরাজ’, কখনো ‘ধূর্জটি’, আবার কখনো ইসলামী ও মধ্যপ্রাচ্যীয় অনুষঙ্গের দিকে চলে যান।
বিভিন্ন ধর্ম ও পুরাণ থেকে নেওয়া প্রতীক তাঁর কবিতায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বৃহত্তর মানবসত্তার অংশ হয়ে যায়।
কবির কল্পনায় কোনো একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য অন্যটিকে সরিয়ে নিজের জায়গা করে নেয় না; বহু ঐতিহ্য একসঙ্গে প্রবাহিত হয়।
নজরুলের সংগীতেও এই ভাবনার গভীর প্রকাশ ঘটেছে। বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাস, আবেগ ও সাংস্কৃতিক অনুভবকে তিনি অসংখ্য ইসলামী গানের মধ্য দিয়ে শিল্পিত রূপ দিয়েছেন। ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ বাঙালি মুসলমানের ঈদ উদযাপনের সঙ্গে প্রায় অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে। আবার একই কবি লিখেছেন অসংখ্য শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও ভজন। কালীকে কখনো মা বলে ডেকেছেন, কখনো কৃষ্ণপ্রেমে রাধার আকুলতা ধারণ করেছেন। ধর্মীয় সংস্কৃতির এত ভিন্ন ভিন্ন ধারায় তাঁর এমন স্বচ্ছন্দ বিচরণ বাংলা সাহিত্যে বিরল।
নজরুলের কাছে এই মিলন শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের আয়োজন ছিল না; এর পেছনে ছিল তাঁর মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টি। ধর্ম মানুষের আত্মিক আশ্রয় হয়ে উঠলে কবি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতা দেখিয়েছেন। কিন্তু সেই ধর্মীয় পরিচয়কে যখন মানুষে-মানুষে বিভেদ ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তখন তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠেছে তীব্র ও প্রতিবাদী। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে সেই ক্ষোভ অত্যন্ত স্পষ্ট। দুই সম্প্রদায়ের বিরোধ দেখে তিনি ব্যথিত হয়েছেন, বিদ্রুপ করেছেন, তীব্র ভাষায় আঘাত করেছেন ধর্মীয় গোঁড়ামিকে। তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ তাই নিছক সম্প্রীতির স্লোগান হিসেবে পড়লে নজরুলের ভাবনার গভীরে পৌঁছা যায় না। একই বৃন্তের কুসুম হওয়ার অর্থ তাঁর কাছে সহাবস্থানের চেয়েও বেশি; পরস্পরের জীবন, সংস্কৃতি, আনন্দ ও বেদনায় জড়িয়ে থাকা।
সে কারণেই ধর্মীয় গোঁড়াদের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক কখনো স্বস্তির ছিল না। মুসলমান সমাজের রক্ষণশীল অংশ তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছে, তাঁকে ‘কাফের’ বলেও আক্রমণ করা হয়েছে। হিন্দু সমাজের সাম্প্রদায়িক অংশও তাঁকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। কিন্তু কোনো পক্ষের সন্তুষ্টির জন্য নিজের সাহিত্যিক অবস্থান বদলাননি তিনি। তাঁর বিদ্রোহের একটি বড় অংশ মানুষের চিন্তা ও জীবনের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিরুদ্ধেও পরিচালিত। ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তাই তাঁর উচ্চারণ—
‘গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
এই মানুষই নজরুলের চিন্তার কেন্দ্র। মন্দির-মসজিদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমানার বাইরে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ তাঁর কাছে বেশি জরুরি। ‘মানুষ’ কবিতায় ভজনালয় ও মসজিদের বন্ধ দরজার সামনে ক্ষুধার্ত মানুষের উপস্থিতি এনে তিনি ধর্মচর্চার এক গভীর স্ববিরোধ উন্মোচন করেছিলেন। যে উপাসনা মানুষের ক্ষুধা, অপমান ও কান্নাকে অগ্রাহ্য করে, তার আচারসর্বস্বতার বিরুদ্ধে তাঁর কলমে বিদ্রুপ জমেছে। প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়েও নজরুলের সেই চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা উপমহাদেশের সমাজ বাস্তবতায় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সমাজে ধর্ম আজও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমানা ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে গভীর প্রভাব বিস্তার করছে। রাজনীতি, নির্বাচন, সামাজিক ক্ষমতা, সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, নাগরিক সম্পর্ক, এমনকি দৈনন্দিন কথাবার্তায়ও ধর্মীয় পরিচয় বারবার সামনে চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই বিভাজনকে আরো দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। একটি গুজব, সম্পাদিত ছবি, পুরনো ভিডিও কিংবা উসকানিমূলক পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়াতে পারে। কখনো তার পরিণতি পৌঁছে যায় উপাসনালয়, বাড়িঘর কিংবা মানুষের জীবনের ওপর আক্রমণ পর্যন্ত। এমন বাস্তবতায় নজরুলের চিন্তা নতুন করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
তবে নজরুলকে শুধু ফুল, গান, জন্মজয়ন্তী আর আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে তাঁর চিন্তার গভীরে পৌঁছা সম্ভব হবে না। পাঠ করতে হবে তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও বিদ্রোহী উচ্চারণের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা সেইসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন, যেগুলো আজও আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে তাড়া করে। একজন মানুষকে তার মানবিক পরিচয়ের আগে ধর্ম দিয়ে বিচার করার অভ্যাস আমাদের সমাজে কতটা গভীরে শিকড় ছড়িয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় পরিচয় কিভাবে কখনো ক্ষমতা ও আধিপত্যের বোধ তৈরি করে, সংখ্যালঘুর জীবন ও সংস্কৃতিকে কিভাবে ক্রমশ সংকুচিত করে—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে নজরুলকে বোঝার সুযোগ কম। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলতে হবে, ধর্মীয় অনুভূতির নামে অন্যের কথা বলার অধিকার রুদ্ধ করার প্রবণতা কেন এত সহজে জনসমর্থন পায়? কেন ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন মত কিংবা অবিশ্বাসকে অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে? কেন ধর্মের অবমাননার অভিযোগ উঠলেই বিচার ও সত্য অনুসন্ধানের আগেই সামাজিক ক্ষোভ কখনো সহিংসতায় রূপ নেয়? কেন একজন মানুষের নাম, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস কিংবা উপাসনার ধরন তার নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে? এই প্রশ্নগুলোর সামনে নজরুলকে দাঁড় করালে তাঁকে আর শুধু অতীতের একজন বিদ্রোহী কবি হিসেবে দেখা যায় না; তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা তখন বর্তমানের ধর্মীয় বিদ্বেষ, পরিচয়ের রাজনীতি, সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট এবং মানুষের স্বাধীনতার সংকটকে বুঝে ওঠার এক তীক্ষ চিন্তাসূত্র হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন সময়ে নজরুলকে কোনো একটি ধর্মীয় পরিচয়ের কবি হিসেবে আলাদা করে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তাঁর ইসলামী গান সামনে এনে শ্যামাসংগীত আড়াল করা কিংবা শ্যামাসংগীত উদযাপন করে তাঁর ইসলামী সাহিত্যকে পাশ কাটানো—দুটি প্রবণতাই নজরুলের পূর্ণতাকে খণ্ডিত করে। সম্ভবত এখানেই আজকের উপমহাদেশের সামনে নজরুল সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রেখে যান। আমরা কি সত্যিই এমন একজন কবিকে ধারণ করতে প্রস্তুত, যিনি নিজের সাংস্কৃতিক সত্তার মধ্যে একাধিক ধর্মীয় ঐতিহ্যকে পাশাপাশি স্থান দিয়েছিলেন? নজরুলের ভারতবর্ষ শেষ পর্যন্ত বহুস্বরের জনপদ। সেখানে পরিচয় থাকবে, বিশ্বাস থাকবে, ধর্মীয় উৎসব থাকবে, নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের গভীর টানও থাকবে; কিন্তু সেই পরিচয় অন্য মানুষের প্রতি ঘৃণার অনুমতিপত্র হয়ে উঠতে পারে না। নিজের ঈশ্বরকে ভালোবাসতে গিয়ে প্রতিবেশীর ঈশ্বরকে অপমান করার কোনো প্রয়োজন কবি দেখেননি। তাঁর সাহিত্য যেন উল্টো পথে হেঁটেছে: যত গভীরভাবে তিনি ইসলামী ঐতিহ্যের কাছে গেছেন, তত সহজেই হিন্দু ঐতিহ্যের মধ্যেও প্রবেশ করেছেন।
আজ যখন পরিচয়ের চারপাশে নতুন নতুন প্রাচীর উঠছে, নজরুলকে নতুন করে পড়ার অর্থ সেই প্রাচীরের ওপারে মানুষের মুখটি খুঁজে নেওয়া। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক সম্ভবত এখানেই : তিনি ধর্ম মুছে দিয়ে মানুষকে খুঁজতে যাননি; ধর্মের বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই মানুষের কাছে পৌঁছেছেন। এই নজরুল আজও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলেন। আর সেই অস্বস্তির মধ্যেই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা। কারণ যে সমাজ মানুষকে হিন্দু-মুসলমান, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু হিসেবে ভাগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, সেখানে নজরুল এসে সমস্ত পরিচয়ের মাঝখানে একটি মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেন। তারপর তাঁরই কণ্ঠে আবার শোনা যায় সেই পুরনো অথচ আজও অসমাপ্ত উচ্চারণ—‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই।’
Publisher & Editor