বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬

জলে চুন তাজা

প্রকাশিত: ০৮:১৪, ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১০

কাজলের দাদু, মানে কাজলের বাবার বড় কাকা একসময় কলেজে ইংরেজি পড়াতেন। কাজলরা তাঁকে ছোট দাদু বলে ডাকে।

বছর পনেরো আগেই চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি এখন বাসায় সারা দিন মোটা মোটা ইংরেজি বই পড়েন আর ঠাকুরমার সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করে সময় কাটান। আর মেয়ে পদ্ম, মানে কাজলদের পদ্ম পিসি থাকেন নতুন বাজার জোড়পুকুরের পাড়ে। মাঝেমধ্যে মা-বাবাকে দেখতে আসেন এই পুরান বাজারের বাপের বাড়ির এই মহল্লায়। কাজল এ বছর ক্লাস নাইনে উঠেছে।

কাজল আর তার বন্ধুরা সব সময়ই এই দাদুকে এড়িয়ে চলে। রাস্তাঘাটে সামনে পড়ে গেলেই হাত উঁচিয়ে ডাকবেন—এদিকে আয়।
তখনই বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। সামনে গেলে গম্ভীর গলায় বলবেন, পড়ালেখা কেমন চলছে? তার পরই বলবেন, ইংরেজি না জানলে কিন্তু বিদেশে পড়তে যেতে পারবি না।

দাদু ঝট করে এর পরই বলে ফেলেন, সোজা রাস্তায় হাঁটা ভালো, এটার ইংরেজি কী হবে বল।

কাজল মনে মনে ট্রান্সলেশনটা চেষ্টা করে, সোজা মানে ইংরেজিতে স্ট্রেইট, রাস্তা ইংরেজি রোড, হাঁটা হলো ওয়াকিং আর ভালো তো গুড। কিন্তু এগুলো এক করে বলা খুব মুশকিল।

দাদু বলেন, বুঝতে পেরেছি, জানিস সবই কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারছিস না। এটাই সমস্যা।

শিখতে হবে। শব্দ দিয়ে মালা গাঁথা জানতে হবে। মুখের জড়তা ভাঙতে হবে আগে।
শব্দ দিয়ে মালা! ছোট দাদু বলেন, আমার কাছে আসবি মাঝে মাঝে, আমি শেখাব। ঠিক আছে যা।

পদ্ম পিসি একদিন বাসায় এসে জানান—আরে আর বলিস না, সেদিন তোর পিসেমশাইকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’ ইংরেজি কী? জানিস তো তোর পিসে ব্যাংকে চাকরি করে। সেই জন্য টাকা নিয়ে ইংরেজি ট্রান্সলেশন ধরতে হবে? তোর পিসেমশাই বলল, ‘মানি সয়েল, সয়েল মানি।’ আর এরপর বাবার সে কী হম্বিতম্বি! পারলে কান ধরে। কে এসব শিখিয়েছে? কোন মাস্টার পড়িয়েছে? এটা নাকি কিচ্ছু হয়নি। এটা হবে ‘মানি ইজ ওয়ার্থলেস’, মানে টাকা মূল্যহীন। তারপর আমাদের বাসায় কিচ্ছু মুখে না দিয়ে রাগে গরগর করতে করতে চলে এলো। এবার বল, এখন বাবা আমাদের বাসায় বেড়াতে গেলেই তোর পিসেমশাই পেছন দরজা দিয়ে ভেগে যায়। তাইতো রক্ষা! শোন, বাবার কাছ থেকে দূরে থাকবি।

কিন্তু সব জায়গায় কি আর রক্ষা পাওয়া যায়? একদিন দাদু বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় চলে আসেন। কাজলের মা বলেন, কাকাবাবু কেমন আছেন? শরীর ভালো তো?

দাদু বলেন, শরীর ভালো, কিন্তু মন ভালো না।

—কেন?

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বংশে একজনও আমার মতো ইংরেজি শিখল না!

কাজলের মা বলেন, তা ঠিকই বলেছেন।

এরপর দাদু আসল খবরটা বলেন, আমি চাই তোমাদের ছেলেটা অন্তত ইংরেজিটা শিখুক। আমি তো আমার কাছে ওকে পাঠাতে বলেছিলাম।

কাজলের মা বলেন, আপনাকে ভয় পায়, তাই যায়নি।

—তা ঠিক। কিন্তু ভয়কে জয় করতে হবে। আচ্ছা ঠিক আছে, ওকে কোনো ইংরেজি শেখার জায়গায় ভর্তি করিয়ে দাও; বিশেষ করে কথা বলাটা। দরকার হলে আমি মাঝেমধ্যে এসে দেখে যাব।

কাজল কথাটা শোনে। মনে মনে ভয় পায়। এই দাদুর কাছে ইংরেজি কথা বলতে হবে! জ্বালিয়ে মারল!

এবার আর রেহাই পাওয়া গেল না। স্পোকেন ইংলিশ শেখার জন্য ওকে কলেজ রোডের ‘অক্সফোর্ড অ্যান্ড কেমব্রিজ ইংলিশ স্পোকেন সেন্টার’-এ ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো। বাবা দাদুকে জানিয়েও এলেন। পরদিনই দাদুর সঙ্গে বিকেলে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল। এই রে সেরেছে! সে মাঠে খেলতে যাচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলেন, কোন কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলি?

—অক্সফোর্ড অ্যান্ড কেমব্রিজ ইংলিশ স্পোকেন সেন্টারে।

—ও হ্যাঁ, তোর বাবা বলেছে। নাম শুনেই ভিরমি খাওয়ার অবস্থা, অক্সফোর্ডের ওপর আবার কেমব্রিজ চাপিয়েছে! দাদু বিরক্তির গলায় বলেন। আচ্ছা, প্রথম দিন কী পড়াল?

—পাখি পাকা পেঁপে খায়, পাখি পাকা পেঁপে খায়।

দাদু তোতলাতে থাকেন, পাখি পাপা পেকে খায়! মানে? এসব কী?

কাজল বুঝিয়ে বলে, জিভের ধার বাড়ানোর জন্য প্রথম দিন এটা ১০০ বার প্যাকটিশ করতে বলেছে।

দাদু এবার রাগেন, আর তোরা ১০০ বার বললি, পাখি পাকা খেপে খায়?

—না দাদু, পাখি পাকা পেঁপে খায়। পাখি পাকা পেঁপে খায়।

দাদু আবারও বলতে চেষ্টা করেন, পাখি পাপা পেকে খায়...ধুত্তরি, যা ইচ্ছা তা খাক! দাদু পাখিকে বাগে আনতে না পেরে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।

এর মধ্যে দুই সপ্তাহ চলে গেছে। কাজলের জিভের ধার এর মধ্যেই অনেকখানি বেড়েছে। এখন সে মিনিটে ৩০ বার ‘পাখি পাকা পেঁপে খায়’ বলতে পারে। কিন্তু কোচিং সেন্টার থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, জিভের ধার দেওয়া চলবে আরো অনেক দিন। এর মধ্যে আরেক দিন কাজল পাউরুটি কিনতে দোকানে গিয়েছিল। পেছন থেকে দাদু ডাকেন—দাদুভাই, শুনে যা।

কাজল পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে, ইংরেজি দাদু! কাজল টাকা দিয়ে সামনে আসে। বলে—দাদু, কেমন আছ? আমি যাই?

—না না, যাবি কি রে? শোন, তোর এখন কেমন চলছে ইংরেজি শেখা?

—খুবই ভালো।

—কী পড়াচ্ছে এখন?

—প্যাঁক অক্কে প্যাক/প্যাঁক দুগুণে প্যাঁক প্যাঁক/তিন প্যাঁকে প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক।

এসব শুনে দাদুর মুখটা কেমন জানি হয়ে গেল। বেশ রেগে বলেন, এখনো জিভে ধার দেওয়া চলছে, অ্যাঁ?

—হ্যাঁ দাদু।

দাদু নিজেই বলতে চেষ্টা করেন, প্যাঁক অক্কে প্যাঁক...তারপর? প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক

—না না, প্যাঁক দুগুণে প্যাঁক প্যাঁক, কাজল ঠিক করে দেয়।

দাদুর মাথা ঘোরায়। কাজলকে বলেন, তুই এখন যা। কাজল পেছন ফিরে দেখে, দাদু বিড়বিড় করছেন, প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক...

একদিন কাজলের বাবার সঙ্গে মাছের বাজারে দাদুর সঙ্গে দেখা। একটু কিনারে নিয়ে কাজলের বাবাকে দাদু বলেন, ছেলের দিকে কোনো খেয়াল রাখিস? নাকি ব্যবসা নিয়েই থাকিস?

—কেন কাকা, কী হয়েছে?

—আরে পাখি পাপা পেকে খায়, প্যাঁক অক্কে প্যাঁক, প্যাঁক দুগুণে প্যাঁক প্যাঁক...তোর ছেলে এসব শিখছে!

কাজলের বাবা পুরো অবাক, এসব কী কাকা? এটা তো হাঁসের ডাক!

—তাহলে আর বলছি কী? এটা নাকি জিভের ধার বাড়াতে প্র্যাকটিস করছে।

—ও তাই বলুন, যাতে গড়গড় করে ইংরেজি বলতে পারে। তাই না?

—ছাই। শোন, এসব করে করে শুধু বেতন নিচ্ছে। দাদু রাগ করে চলে যান।

দিন যায়। মাসও যায়। প্রায় দুই মাস চলে গেছে। কাজলের জিভের ধার এখন অন্য রকম। দাদু প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন ব্যাপারটা। কাজলের বাবাই একদিন রাস্তায় দাদুকে দেখে বললেন, কাকাবাবু, কাজল তো এখন বেশ ভালো করছে ক্লাসে। আপনি একদিন বাসায় আসুন। দেখে যান। দাদু মহা উৎসাহে সেদিন সন্ধ্যায়ই কাজলদের বাসায় এসে হাজির। অ্যাঁই, তোমরা কোথায় আছ। কই রে দাদুভাই?

দাদু সোজা কাজলের পড়ার ঘরে ঢুকে যান। কাজল তখন পড়তে বসেছে। কাজলের মা কফি আর আপেল নিয়ে আসেন। দাদু কাজলের মাকে বলেন, তুমি যাও। আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলব। কাজলকে ধীরেসুস্থে বলেন, কি, এখন কী পড়াচ্ছে? বেসিক জিনিস শুরু করেছে? একটা বাক্য বল তো তোর পছন্দমতো। তারপর আমি বলব।

—তেলে চুল তাজা/জলে চুন তাজা, তেলে চুল তাজা/জলে চুন তাজা।

দাদুর চোখ বড় বড় হয়ে যায়, মানে? তেলে চুল তাজা/চুনে জল তাজা! নাহ্, চুনে তেল তাজা/চুলে তেল তাজা। ধুত্তরি! দাদু পুরোপুরি গোলমাল পাকিয়ে ফেলেন।

কাজল আবার বলে—না দাদু, তেলে চুল তাজা/জলে চুন তাজা।

দাদু এবার রাগে চিৎকার করে ওঠেন, এখনো জিভের শাণ দেওয়া চলছে? চুনে জল তাজা! চিৎকার শুনে কাজলের মা দৌড়ে আসেন, কী হয়েছে কাকাবাবু?

দাদু মহা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, চুনে জল তাজা! নাহ্ চুনে তেল তাজা! ও মাই গড! আমি কাল থেকে ওকে নিজেই পড়াতে আসব।

কাজলের মা কিছু বুঝতে না পেরে শুধু বলেন, চুনে তেল তাজা! কাকাবাবু এসব কী বলছেন?

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor