পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া একটি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা, যা শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই এই সমস্যা কমে যায়। তবে ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে গেলে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা কখনও কখনও গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তাই ডায়রিয়ার লক্ষণ, কারণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
ডায়রিয়া কী?
স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বার পাতলা বা পানির মতো পায়খানা হওয়াকে ডায়রিয়া বলা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। তবে ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, দূষিত খাবার, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা হজমের সমস্যাও ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।
ডায়রিয়ার ধরন
স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে ডায়রিয়াকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়—
স্বল্পমেয়াদি ডায়রিয়া: সাধারণত এক থেকে দুই দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।
দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া: দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে।
অতি দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া: চার সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডায়রিয়া হওয়ার কারণ
বিভিন্ন কারণে ডায়রিয়া হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংক্রমণ
দূষিত বা বাসি খাবার গ্রহণ
খাদ্যে বিষক্রিয়া
কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
দুধ বা নির্দিষ্ট খাবার হজমে সমস্যা
অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা উদ্বেগ
ডায়রিয়ার সাধারণ লক্ষণ
ডায়রিয়া হলে সাধারণত পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা বা মোচড়, পেট ফাঁপা, ঘন ঘন পায়খানার চাপ এবং বমিভাব দেখা দিতে পারে।
তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন—
বেশি জ্বর
তীব্র পেটব্যথা
বারবার বমি
পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা অতিরিক্ত শ্লেষ্মা
দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
পানিশূন্যতার লক্ষণ
পানিশূন্যতার বিষয়ে সতর্ক থাকুন
ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ বের হয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে চোখ বসে যাওয়া, কান্নার সময় চোখে পানি না আসা এবং প্রস্রাব কম হওয়া পানিশূন্যতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
বাড়িতে প্রাথমিকভাবে কী করবেন?
পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
শরীরের পানিশূন্যতা পূরণে খাবার স্যালাইন গ্রহণ করুন।
অল্প অল্প করে বারবার তরল খাবার খান।
কলা, সাদা ভাত, টোস্ট, আলু ও হালকা স্যুপের মতো সহজপাচ্য খাবার খেতে পারেন।
তেল-মসলাযুক্ত খাবার, কোমল পানীয়, অ্যালকোহল ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন।
শিশুর ডায়রিয়ায় করণীয়
শিশুর ডায়রিয়া হলে বুকের দুধ বন্ধ করা উচিত নয়। বরং স্বাভাবিকভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অল্প অল্প করে বারবার তরল বা খাবার স্যালাইন দিতে হবে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে কোনো ওষুধ দেওয়া ঠিক নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
ডায়রিয়া কয়েক দিনের বেশি স্থায়ী হলে, পায়খানায় রক্ত দেখা গেলে, উচ্চ জ্বর হলে, শরীর অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়লে বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডায়রিয়া প্রতিরোধের উপায়
খাবারের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
সবসময় বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।
ভালোভাবে রান্না করা খাবার খেতে হবে।
নষ্ট বা দূষিত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
ভ্রমণের সময় নিরাপদ খাবার ও বোতলজাত পানি ব্যবহার করতে হবে।
শিশুদের প্রয়োজনীয় টিকা সময়মতো নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ ডায়রিয়া সাধারণ যত্নেই ভালো হয়ে যায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে না দেওয়া। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে ডায়রিয়ার কারণে সৃষ্ট জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব।
Publisher & Editor