নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লড়াইয়ের সফলতা এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে কি না, তার ওপর। বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের পতনের হাত থেকে রক্ষা করা এবং আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধ এড়িয়ে চলাও এখন তার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তুরস্কের ইতিহাস এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ে একটি সতর্কবার্তা এবং একই সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের ডারডানেলেস প্রণালির ইতিহাস বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। সংকীর্ণ ওই জলপথ ইজিয়ান সাগরের সঙ্গে মারমারা সাগর এবং ব্ল্যাক সি বা কৃষ্ণসাগরকে যুক্ত করেছে।
হরমুজ প্রণালি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র। বিশ্বের মোট তেল ভোগের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে হয়। ঠিক এ কারণেই এখানে সামরিক শক্তির প্রয়োগের চিন্তা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
মন্ট্রে কনভেনশন ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ১০টি দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর ফলে শান্তি বজায় থাকার সময় কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা হয়, তেমনি যুদ্ধের সময় জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা পায় তুরস্ক। সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তুরস্ক এই ক্ষমতার ব্যবহার করেই রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ রুখে দিয়েছিল।
যেকোনো শক্তিশালী দেশের কাছে এমন সংকীর্ণ জলপথকে কেবলই একটি সামরিক বাধা মনে হতে পারে, যা শক্তি প্রয়োগ করে জয় করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এসব কৌশলগত জলপথ কেবল ভৌগোলিক বাধা নয়, বরং তা সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্ব এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের এক কঠিন পরীক্ষা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী এ সত্যই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। ডারডানেলেস প্রণালিতে অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান উইনস্টন চার্চিল এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলেন, যা গ্যালিপোলি অভিযান নামে পরিচিত। ব্রিটিশদের লক্ষ্য ছিল এ পথ খুলে দিয়ে রাশিয়াকে সাহায্য করা এবং অটোমানদের যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু সে অভিযান পরিণত হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম রক্তাক্ত বিপর্যয়ে। এতে মিত্রবাহিনীর ৪৪ হাজার, অটোমানদের ৮৬ হাজারসহ প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। শেষ পর্যন্ত চার্চিলকে পদত্যাগ করতে হয়।
তুরস্কের জন্য গ্যালিপোলি হলো এক নতুন জাতি গঠনের বীরত্বগাথা। আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এই যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রথম পরিচিতি পান। ‘চানাককালে পার হওয়া সম্ভব নয়’—এটি এখনো তাদের জাতীয় গর্বের একটি জনপ্রিয় স্লোগান। ব্রিটিশদের এই পরাজয় রাশিয়ার একমাত্র নৌ রপ্তানির পথটিও বন্ধ করে দিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় রাজতন্ত্রের পতন এবং বলশেভিকদের ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার চেষ্টা আমেরিকার জন্য অনেক বড় ঝুঁকি হতে পারে। ইরান এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাগরে মাইন ব্যবহারের মাধ্যমে শক্তিশালী নৌবাহিনীকেও বিপদে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে এখন কেবল যুদ্ধ করা অথবা ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার মতো সীমিত বিকল্প নেই। তিনি তুরস্কের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি টেকসই চুক্তি করতে পারেন। ১৯৩৬ সালের ‘মন্ট্রে কনভেনশন’ এ ক্ষেত্রে একটি অনুপ্রেরণা হতে পারে। সেই চুক্তির মাধ্যমে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব যেমন নিশ্চিত হয়েছিল, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথও খোলা ছিল।
মন্ট্রে কনভেনশন ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ১০টি দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর ফলে শান্তি বজায় থাকার সময় কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা হয়, তেমনি যুদ্ধের সময় জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা পায় তুরস্ক। সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তুরস্ক এই ক্ষমতার ব্যবহার করেই রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ রুখে দিয়েছিল। এই চুক্তি ছিল নিয়ম-শৃঙ্খলার এক অনন্য সমঝোতা, যা বাণিজ্য ও নিরাপত্তা উভয়কে রক্ষা করেছিল।
যদিও হরমুজ ও তুরস্কের পরিস্থিতি হুবহু এক নয়, তবে মন্ট্রে মডেল এখানে প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমান উভয়ের সীমান্তে অবস্থিত। প্রধানত জাহাজ চলাচলের পথগুলো ওমানের জলসীমায় পড়ে। তাই এখানে কোনো চুক্তি করতে হলে তাতে জাহাজ বা তেলের ট্যাংকারে আক্রমণ না করা, সমুদ্রে মাইন না পাতা এবং কোনো সংঘাত এড়ানোর জন্য কঠোর নিয়ম থাকতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘ বা আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি ছোট দল কাজ করতে পারে।
ওয়াশিংটনের উচিত হবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে একটি বহুপক্ষীয় কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া, যা অবাধ জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দেয়। ইরানের কিছু স্বার্থ পূরণ করার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেখান দিয়ে নির্বিঘ্নে বাণিজ্যের আইনি ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি দাবি করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি কোনো কাল্পনিক ধারণা দিয়ে সম্ভব নয়, বরং ইরানের ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী পথে হাঁটা জরুরি।
এ পদক্ষেপ কেবল কৌশলগত কূটনীতি নয়, বরং এটি এক রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া। ইতিহাস বলে যে কৌশলগত চেকপয়েন্টগুলো কেবল পেশিশক্তি দিয়ে শাসন করা যায় না, বরং নিয়ম এবং ভারসাম্য দিয়ে রক্ষা করতে হয়। ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে, হরমুজ যেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য আরেকটি গ্যালিপোলি ট্র্যাজেডি হয়ে না দাঁড়ায়। তাই তাঁর উচিত এখন থেকেই একটি কার্যকর চুক্তির ভিত্তি স্থাপন করা।
Publisher & Editor