সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

ইরান যুদ্ধে না জড়িয়েও চড়া মূল্য দিতে হবে ইউরোপকে

প্রকাশিত: ০৯:০২, ১৬ মার্চ ২০২৬ |

কোনোভাবেই ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে সম্পৃক্ত বলা যায় না। ইউরোপীয় সেনারা ইরানের মালভূমিতে হামলা চালাচ্ছে না। ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানও তেহরানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে আঘাত হানছে না। তবু সংঘাত যত দিন থেকে সপ্তাহে গড়াচ্ছে, যুদ্ধের বোঝা ততটাই ইউরোপের কাঁধে এসে পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সাধারণত আঞ্চলিক সীমার ভেতরে আটকে থাকে না। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ যুদ্ধ ইউরোপের জন্য শুধু ভূরাজনৈতিক নয়; অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে অভিবাসনপথ, ন্যাটো জোট থেকে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এর ঢেউ ইতিমধ্যেই ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রথম ধাক্কাটি কৌশলগত। যুদ্ধটি নিয়ে ইউরোপ নিজেই গভীরভাবে বিভক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্ক ভাষায় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। এ ভাষা আসলে ২৭টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার কঠিন বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। কারণ, এ সংঘাত নিয়ে তাদের অবস্থান এক রকম নয়।

এই বিতর্কের এক প্রান্তে আছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন গোপন করেননি। পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তর প্রচেষ্টা হিসেবে তিনি তেহরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। বার্লিনের অনেক কৌশলবিদের কাছে বিষয়টি সরল। তাঁদের মতে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক শুধু ইসরায়েলের জন্য নয়, পুরো পশ্চিমা নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্যই হুমকি।

মের্ৎসের অবস্থান জার্মানির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কৌশলগত নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই নীতির মূল তিনটি স্তম্ভ হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সংহতি, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং এই বিশ্বাস যে কখনো কখনো ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, এটি এমন এক কাজ, যা অন্যদের জন্যও করা হচ্ছে।

ইউরোপ হয়তো এই যুদ্ধে সরাসরি লড়ছে না। কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি থেকে তার মুক্তি নেই। আগামী কয়েক সপ্তাহই বলে দেবে ইউরোপ এই সংকটের মুখে ঐক্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাত আবারও ইউরোপের ভেতরের বিভাজনকে গভীর করে তুলবে। কিন্তু ইউরোপের রাজনৈতিক পরিসরের অন্য প্রান্তে আছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে স্পেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সানচেজ এ হামলাকে উত্তেজনা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে এটি পুরো অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, এই যুদ্ধ লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক জুয়া খেলার মতো। 

মের্ৎস ও সানচেজের অবস্থানের এই সংঘাত ইউরোপের একটি গভীর সমস্যাকে সামনে আনে। মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে ইউরোপের কোনো একক কৌশলগত নীতি নেই। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল ইউরোপকে প্রভাবিত করবে, তারা একমত হোক বা না হোক। সবচেয়ে দ্রুত যে অভিঘাতটি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনৈতিক। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ ও জাহাজ চলাচল নিয়ে সতর্কতার কারণে এই পথ ইতিমধ্যেই বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে জানা গেছে। 

মনে হচ্ছে, এক ধরনের আতঙ্ক বা ফোবিয়ায় ইসরায়েল আক্রান্ত হয়েছে। মনে হচ্ছে, অস্তিত্ব সংকটে পড়ার মতো কোনো অনুভূতি রাষ্ট্রটির নেতাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে
ইউরোপের জন্য সময়টি মোটেই সুবিধাজনক নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাত থেকে ইউরোপ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ইউরোপীয় অর্থনীতি এখনো জ্বালানির ধাক্কার প্রতি খুব সংবেদনশীল। গত তিন বছরে রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে ইউরোপ এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করেছে, নতুন উৎস খুঁজেছে এবং আমদানিতে বৈচিত্র্য এনেছে। তবু একটি মৌলিক বাস্তবতা রয়ে গেছে। ইউরোপ তার জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করে। 

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যদি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে, ইউরোপ খুব দ্রুত তার প্রভাব টের পাবে। জ্বালানির দাম বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে এই সংঘাত বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক গতিকে দুর্বল করতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ সময়ের মুদ্রাস্ফীতির পর তারা ধীরে ধীরে সুদের হার শিথিল করার পথে হাঁটছিল। কিন্তু জ্বালানির দাম আবার বাড়লে সেই সিদ্ধান্ত কঠিন হয়ে উঠবে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তবে অর্থনীতি হয়তো যুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ফোরক রাজনৈতিক প্রভাব নয়। অভিবাসন হতে পারে আরও বড় প্রশ্ন। গত এক–চতুর্থাংশ শতকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি বড় সংঘাতই শেষ পর্যন্ত ইউরোপে শরণার্থী স্রোত তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম না–ও হতে পারে। বিশেষ করে যদি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অথবা ইরাক, লেবানন কিংবা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। এর একটি ছোট অংশও যদি আশ্রয়ের খোঁজে ইউরোপমুখী হয়, তাহলে ইউরোপের অভিবাসনব্যবস্থা তীব্র চাপের মুখে পড়বে। ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর থেকেই এ ব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে নড়বড়ে হয়ে আছে। আর ইউরোপে অভিবাসনের প্রশ্ন খুব দ্রুত মানবিক ইস্যু থেকে রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ নেয়।

পুরো মহাদেশে জনতুষ্টিবাদী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলো সীমান্ত, পরিচয় ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে। জার্মানির রাজনৈতিক দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি, ইতালির জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ফ্রান্সে মেরিন লো পেনের আন্দোলন কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কট্টরপন্থী দলগুলোতে এই প্রবণতা স্পষ্ট। নতুন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে যদি আবার আশ্রয়প্রার্থীর ঢল নামে, তাহলে এসব রাজনৈতিক শক্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক বৈপরীত্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ইউরোপীয় সরকারগুলোকে বিদেশে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন বা সহনীয় করে তুলতে পারে, সেই অস্থিরতাই পরে দেশের ভেতরের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। সিরিয়া যুদ্ধের পর ইউরোপ এই বাস্তবতা দেখেছে। ইরান যুদ্ধ সেই অভিজ্ঞতাকে আবার সামনে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপ এক পরিচিত পরিস্থিতির মুখোমুখি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরে থেকেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে তার অভিঘাত থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার প্রভাব তত তীব্র হবে। জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। অভিবাসনের চাপ বাড়তে পারে। জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। আটলান্টিক জোটের ভেতরে মতপার্থক্যও বাড়তে পারে।

ইউরোপ হয়তো এই যুদ্ধে সরাসরি লড়ছে না। কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি থেকে তার মুক্তি নেই। আগামী কয়েক সপ্তাহই বলে দেবে ইউরোপ এই সংকটের মুখে ঐক্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাত আবারও ইউরোপের ভেতরের বিভাজনকে গভীর করে তুলবে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor