সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

ইরান যুদ্ধের আগুনে যেভাবে জ্বলছে বেলুচিস্তান

প্রকাশিত: ০৬:৫০, ৩০ মার্চ ২০২৬ | ১১

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, দীর্ঘদিনের বৈরী এই দুই শক্তির আলোচনা হতে পারে ইসলামাবাদে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষের সঙ্গেই নিবিড় যোগাযোগের খবর পাওয়া গেছে। এমনকি খবর বেরিয়েছে, ২২ মার্চ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি আলাপ করেছেন, যার পরপরই যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য আলোচনার খবরগুলো সামনে আসতে শুরু করে।

ইসলামাবাদের জন্য এই কূটনৈতিক সাফল্য আপাতদৃষ্টিতে বেশ উজ্জ্বল মনে হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অস্তিত্ব সংকটের প্রশ্ন। বিশেষ করে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অস্থির প্রদেশ বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি ইসলামাবাদের জন্য এক নতুন অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষাচুক্তি’ রক্ষা করার চাপও বিদ্যমান।

পাকিস্তান ও ইরান সীমান্তের দুই পাশেই বিরাজ করছে যুদ্ধপরিস্থিতি। পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর ইরান থেকে সীমান্ত অতিক্রমী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অভাবনীয় হারে বেড়েছে।

একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এ পরিস্থিতির গভীরতা বোঝাতে গিয়ে ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’কে বলেন, ‘আমরা এখন বেলুচিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আরও বড় ধরনের তৎপরাতার আশঙ্কা করছি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান ও ইরান একে অপরের ভূখণ্ডে তথাকথিত জঙ্গি আস্তানায় যেভাবে বিমান হামলা চালিয়েছে, তা সেই চরম অস্থিতিশীলতারই প্রতিফলন।’ 

পাকিস্তানের প্রায় ৪৪ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ প্রদেশ বেলুচিস্তান। এর সঙ্গে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তানের বালুচ অঞ্চল নিয়ে যে ‘গ্রেটার বেলুচিস্তান’ নামের জাতীয়তাবাদী ধারণা, তা সাম্প্রতিক দশকগুলোয় সশস্ত্র রূপ নিয়েছে।

অঞ্চলটির স্বাধীনতাকামী সংগঠন বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) চীনা বিনিয়োগকে ‘নব্য ঔপনিবেশিক প্রকল্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠীগুলোও আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে দক্ষিণ দিকে সরে এসে ইরান সীমান্তে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। 

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উত্তেজনার মধ্যে অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী এখন ইরান সীমান্তকে নিরাপদ স্বর্গ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

বেলুচিস্তানে শুধু বালুচ জাতীয়তাবাদী লড়াই নয়, সেখানে যোগ হয়েছে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিষ। আইএস (খোরসান) এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো সুন্নি জিহাদি গোষ্ঠীগুলো বরাবরই খ্রিষ্টান ও শিয়া হাজারা সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। অন্যদিকে ইরানের সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যের আদলে পাকিস্তানেও সশস্ত্র শিয়া গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বাড়ছে।

পাকিস্তানের প্রায় ৪৪ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ প্রদেশ বেলুচিস্তান। এর সঙ্গে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।
‘লিওয়া জাইনাবিয়ুন’-এর মতো শিয়া গোষ্ঠীগুলো এখন আর শুধু সিরিয়া বা ইরাকে সীমাবদ্ধ নয়, তারা খোদ পাকিস্তানেও প্রভাব বিস্তার করছে। এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও কূটনীতির পক্ষে বলায় পাকিস্তানে জনৈক সাংবাদিক খুনের দায়ভারও তাদের ওপরে এসেছে।

গত বছর সুন্নি উগ্রবাদী দল ‘জবহে-ই মুবারিজিন-ই মারদুমি’ (জেএমএম) এক জোট হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও চরমে পৌঁছেছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল তালাত মাসুদের মতে, ‘রাষ্ট্রের এমনভাবে সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন পরিচালনা করা উচিত, যাতে কোনো বিশেষ নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায় নিজেদের বঞ্চিত বা টার্গেট বলে মনে না করে।’

একদিকে ভারতের সঙ্গে চিরশত্রুতা, অন্যদিকে আফগান সীমান্তে চরম উত্তেজনা—এই ত্রিমুখী চাপের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এখন বালুচ অঞ্চলে কঠোর নজরদারি ও সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। কিন্তু এই সামরিকায়ন বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষের জন্য ডেকে আনছে দুর্ভোগ। গত এক দশকে হাজার হাজার নিখোঁজ মানুষ (ফোর্সেড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স) এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দমন–পীড়নের অভিযোগে বালুচ জনগণের মনে রাষ্ট্রের প্রতি চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

বালুচ নেতা সাম্মি দ্বীন বালুচ বিষয়টিকে বেশ উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি আঞ্চলিক দ্বন্দ্বকেই সাধারণ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নেওয়া হয়। রাষ্ট্র প্রায়ই রাজনৈতিক দাবি ও ভিন্নমতকে ‘নিরাপত্তাঝুঁকি’ হিসেবে তকমা দিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করছে।

ইসলামাবাদ যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে টেবিলে বসতে যাচ্ছে, তখন মনে রাখা প্রয়োজন যে, তাঁদের নিজেদের ঘরও আগুনে পুড়ছে। আঞ্চলিক মধ্যস্থতায় বিশ্ববাসীর সাধুবাদ কুড়ানো ভালো, কিন্তু নিজেদের ঘরের অসন্তোষ এবং প্রান্তিক মানুষের চাপা আর্তনাদ নিরসন না করলে বেলুচিস্তানে যে আগুন জ্বলছে, তা একদিন পাকিস্তানের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে। মধ্যস্থতার মঞ্চে পাকিস্তানের প্রাপ্তি হবে শূন্য, যদি নিজের মাটিতে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা যায়।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor