শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

প্রকাশিত: ০৫:৩৯, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০

নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির বার্ষিক সাধারণ সভা গত ২৮ ডিসেম্বর রোববার অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা সাতটার দিকে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বার্ষিক সাধারণ সভা। এসময় বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। সাধারণ সভায় সদস্যরা অভিযোগ করেন, আগের কমিটি অনিয়ম করে আড়াই লাখ ডলারের তহবিল তছরুপ করে গেছে। আর বর্তমান কমিটি পানির মত যত্রতত্র অর্থ খরচ করছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ৫০ বছরের নিয়ম ভেঙে তহবিলের অর্থে অভিষেক অনুষ্ঠান করেছে তারা। এছাড়াও অনেক খরচের বিবরণ নেই কোষাধ্যক্ষের প্রতিবেদনে। ইফতার পার্টি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করতে গিয়েও খরচ হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। এ ধরনের বিলাসী ও অস্বচ্ছ ব্যয় নিয়ে সাধারণ সভায় প্রশ্ন তুলেছেন সদস্যরা। আর এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আগের কমিটি ও বর্তমান কমিটি একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়েছেন।

এদিকে, এজেন্ডাবিহীন সাধারণ সভা আয়োজন নিয়েও সাধারণ সদস্যরা প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছেন কর্মকর্তাদের। কোনো প্রকার সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন ছাড়াই গঠনতন্ত্রের দায় এড়াতে আয়োজন করা হয়েছিল এই সাধারণ সভার। সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আগামী ফেব্রুয়ারিতে আরেকটি বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বান করার ঘোষণা দিয়েছেন কর্মকর্তারা। কিন্তু এই সাধারণ সভা আয়োজনের ব্যয় কোথা আসবে সেটি নিয়েও অনেকে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অন্যদিকে, ৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের ‘বাংলাদেশ সেন্টার’ কেনা নিয়েও নানার শঙ্কার কথা বলেছেন সাবেক কমকর্তা ও সাধারণ সদস্যরা। তারা বলেছেন, নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ ছাড়াই এ ধরনের ব্যয়বহুল ভবন কিনতে গিয়ে বাংলাদেশ সোসাইটি আবার দেউলিয়া না হয়ে যায়। কারণ- ভবনটি কেনা হলে প্রতিমাসে মর্গেজ দিতে হবে লক্ষাধিক ডলার। এই অর্থের যোগান হবে কীভাবে? অনেকে বলেছেন- যে ভবনটি কেনা হয়েছে সেটিতে অনেকগুলো ভায়োলেশন রয়েছে। কোনো নির্মাণ কাজ করা যাবে না। তবে- আশার বাণী শুনিয়েছেন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ। তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করেন যে সবাই মিলে বাংলাদেশ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করবো। তিনি এক লাখ ২৫ হাজার ডলার অনুদান দিয়েছেন। প্রয়োজনে আরো দেবেন। ভবন নিয়ে সমস্যা হলে প্রয়োজনে চুক্তি বাতিল করবেন। প্রাথমিক চুক্তিতে সেই শর্তের কথা উল্লেখ আছে। দরকার হলে অন্য কোথাও ভবন কিনবো। তবুও বাংলাদেশ সেন্টার হবে, উল্লেখ করেন শাহনেওয়াজ।

এদিকে- আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে কিছুটা হট্টগোল আর উত্তেজনা দেখা দেয়। বিপুল অর্থ ব্যয় করে নিয়োগ দেওয়া নিরাপত্তা কর্মীরা এসময় সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সাধারণ সভায় কবরের জায়গা কেনার প্রযোজনীয়তা নিয়েই শুরু হয় প্রথম বিতর্ক। অর্থের নয়-ছয় আর হিসেবের গরমিলের জন্য আগের কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তদের দোষারোপ করেন বর্তমান কমিটি। সভায় উপস্থিত আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পান। তিনি উল্লেখ করেন, সবার সম্মতি নিয়ে কবর কেনা হয়েছিল। এজন্য ভুলক্রুটি হলে উপস্থিত সদস্যদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান তিনি। ২৮ ডিসেম্বর রোববার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের উডসাইডে কুইন্স প্যালেসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় সম্পাদকীয় রির্পোট পেশ করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী। ১৭৫জন সদস্যের উপস্থিতিতে এমন আয়োজনে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

আয়-ব্যয়ের হিসাব পেশ করেন কোষাধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া রুমী। প্রতিবেদনটি বড় স্ক্রিণে দেখানো হচ্ছে-এটাকে বড় সাফল্য দাবি করলেও তিনি অনেক হিসাবই স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে পারেননি। বরং ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার সঞ্চয় স্থিতি থাকলেও এখন আছে মাত্র ৭৫ হাজার ডলার। বিগত কমিটির সভায় স্ক্যামের কারণে ব্যাংক থেকে মোটা অংকের অর্থ খোয়া গেছে বলে জানানো হয়েছিল। সে বিষয়টি বর্তমান কমিটি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন কোষাধ্যক্ষ বর্তমান কমিটির। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার অগ্রগতিও জানানো হয়নি সাধারণ সভায়। আগের কমিটির উপর দায় চাপিয়ে এ বিষয়টি কৌশলে এড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। এ ধরনের অনেকগুলো অর্থ খরচের হদিস নেই কোষাধ্যক্ষের প্রতিবেদনে। আবার কিছু খরচ উল্লেখ থাকলেও সেগুলোর বর্ণনা নেই কোষাধ্যক্ষের রিপোর্টে। এ বিষয়টি নজর কেড়েছে সাধারণ সদস্যদের।

বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে কররের জায়গা ক্রয় বিষয়টি নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন। অনিয়মতান্ত্রিকভাবে আড়াই লাখ ডলারে কবরের জায়গা কিনে তা বাতিল করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এছাড়া তহবিল থেকে অভিষেক করারও সমালোচনা করেন তিনি। এসময় দুইবারের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম. আজিজ জাতীয় দিবস পালনে সোসাইটির অর্থ ব্যয়, সংগঠনের বাড়ির ট্যাক্স মওকুফ করতে না পারা, কবর কেনা, সংগঠনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিপুল অর্থ অপচয়ের অভিযোগ করেন। এভাবে চলতে থাকলে সংগঠন বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও করেন তিনি। ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে সবার মতামতের ভিত্তিতে কাজ করার অঙ্গিকার করেন সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও সংগঠিত হবে।

সবাই মিলে কাজ করে সংগঠনটির জন্য নতুন ভবন করার কথা বলেন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ। প্রয়োজনে ২ মিলিয়ন ডলার দিয়ে হলেও বাংলাদেশ ভবন করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সাধারণ সদস্যরা তার ভূমিকার ভুয়সী প্রশংসা করেন। সাধারণ সভায় সদস্যদের উপস্থিতি ছিল হতাশাব্যঞ্জক। মাত্র ১৭৫ জন উপস্থিত ছিলেন। অথচ সোসাইটির সদস্য ১৮ হাজারের বেশী। বর্তমান কমিটির কর্মকর্তারা গঠনতন্ত্রের ফাঁকফোকর দিয়ে বার বার বলতে চেয়েছেন- সভার কোরাম পূর্ণ হয়েছে। অথচ নির্বাচনের আগে দুই প্যানেলের প্রার্থিরা ১৮ হাজার ভোটার বা সদস্য করলেও সাধারণ সভার আগে কোনো সদস্য বা ভোটারের খোঁজ রাখেননি কেউ।

নির্বাচনের পর আজীবন সদস্য ছাড়া আর কেউই সদস্য থাকেন না। সাধারণ সভার আগে নিজেদের অর্থে সদস্যপদ নবায়ন করেন, তারা এবং আজীবন সদস্যরাই সাধারণ সভায় অংশ নিতে পারেন। একটি স্পষ্ট অস্বচ্ছ বিষয় বছরের পর বছর টেনে নিয়ে যাচ্ছে কমিটিগুলো। অনেকে সাধারণ সভার খবরও জানতে পারেননি। কর্মকর্তাদের দাবি- পত্রিকায় সাধারণ সভার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। অথচ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে হাফপাতা, যা অনেকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। কাউকে সভার জন্য ফোন করা হয়নি, এমনকী চিঠিও দেওয়া হয়নি। এদিকে নির্বাচনে বর্তমান কমিটি অনলাইনে সদস্যপদের জন্য আবেদন ও নবায়নের সুবিধা চালু করার প্রতিশ্রুতি দিলেও নানান অজুহাতে তা এখনো আটকে আছে। যদিও সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে এ সুবিধা চালু হবে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor