নিউইয়র্কের কুইন্সে বাংলাদেশি চক্রবর্তী পরিবারের ৯১১ নম্বরে করা এক জরুরি ফোনকলের পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের পেট্রোল অফিসার টাইরি হোয়াইট। পরিবারের অভিযোগ ছিল, তাদের ২২ বছর বয়সী ছেলে জাবেজ চক্রবর্তী মানসিক বিকারের তীব্র অবস্থার মধ্যে ছিলেন।
এই ধরনের সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য হোয়াইটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তিনি মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ করার জন্য নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের চার দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছিলেন এবং সংকট মোকাবিলা দল নামে পরিচিত বিশেষ ইউনিটের সদস্য হিসেবেও সনদপ্রাপ্ত ছিলেন। এছাড়া জোরপূর্বক মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার জন্য কাউকে হাসপাতালে নেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও তিনি আলাদা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
এই প্রশিক্ষণগুলোতে কর্মকর্তাদের বলা হয়, এমন পরিস্থিতিতে যতটা সম্ভব শক্তি প্রয়োগ এড়িয়ে চলতে হবে, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি শান্ত করতে হবে এবং কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্তিকে সহযোগিতায় রাজি করাতে হবে। কিন্তু গত ২৬ জানুয়ারি চক্রবর্তী পরিবারের বাড়িতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
অফিসার হোয়াইট যখন পরিবারের বসার ঘরে প্রবেশ করেন, তখন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা জাবেজ একটি বড় রান্নাঘরের ছুরি তুলে নেন এবং তার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট তার সার্ভিস রিভলভার বের করে জাবেজের দিকে তাক করেন এবং চিৎকার করে বলেন, “ছুরিটা নিচে রাখো।”
হোয়াইট পিছিয়ে গিয়ে প্রবেশপথের একটি ছোট কক্ষে চলে যান এবং তাদের মাঝখানে একটি কাচের দরজা বন্ধ করেন। কিন্তু জাবেজ সেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়েন। তখন অফিসার হোয়াইট চারটি গুলি ছোড়েন, এতে জাবেজ গুরুতরভাবে আহত হন। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র ১৬ সেকেন্ডের মধ্যে। পরিস্থিতি শান্ত করার বা কথোপকথনের কোনো সুযোগই ছিল না। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জাবেজের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গুরুতর ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের প্রশিক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে তুলে ধরেছে, যাতে মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ কমানো যায় এবং প্রাণঘাতী ঘটনার সংখ্যা হ্রাস পায়। ২০১৭ সাল থেকে এই প্রশিক্ষণ পুলিশ একাডেমির পাঠ্যক্রমেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সিটি’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন এই প্রশিক্ষণের কারণে বহু সংকটজনক পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল কোনো শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই সমাধান হয়। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বেচ্ছায় হাসপাতালে যেতে বা পরিবারের সঙ্গে চলে যেতে সম্মত হন। তবে সব সময় পরিস্থিতি এভাবে শেষ হয় না।
দ্য সিটির প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের পর থেকে অন্তত আটটি ঘটনায় মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ৯১১ কলের জবাবে গিয়ে পুলিশকে গুলি চালাতে বা বৈদ্যুতিক শক অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ছয়টিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিহত হন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব ঘটনার প্রতিটিতেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংকট মোকাবিলা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন।
এই ধরনের ঘটনার পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি তুলেছেন যে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কলগুলোতে পুলিশের ভূমিকা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা উচিত। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির প্রস্তাবিত কমিউনিটি সেফটি বিভাগ গঠনের পরিকল্পনাতেও এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মামদানি বর্তমানে চালু থাকা একটি কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই কর্মসূচির আওতায় অ-সহিংস হিসেবে বিবেচিত কলগুলোতে পুলিশ নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের পাঠানো হয়।
মেয়রের মুখপাত্র স্যাম রাসকিন বলেন, “মেয়র বিশ্বাস করেন পুলিশ বিভাগের উচিত কার্যকর ও প্রমাণভিত্তিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা। আমাদের প্রশাসন শহরে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় থাকা মানুষের প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাকে কীভাবে উন্নত করা যায় তা মূল্যায়ন করছে। একই সঙ্গে কমিউনিটি সেফটি বিভাগের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও চলছে।”
তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ৯১১ মানসিক স্বাস্থ্য কল সম্ভাব্য সহিংস হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থলে পুলিশই পাঠানো হয়। দ্য সিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ৯১১ কলের ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশকে পাঠানো হয়েছে। নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের সময় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা ব্রায়ান স্টেটিন বলেন, “আমার মতে এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ পাঠানো জরুরি। কেউ কেউ মনে করেন অর্ধেক কল পুলিশ ছাড়াই পরিচালনা করা সম্ভব, কিন্তু আমার কাছে এটি খুব আশাবাদী ধারণা মনে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে নতুন ব্যবস্থা চালু হলেও মানসিক সংকটসংক্রান্ত বহু ঘটনায় পুলিশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। তাই সংকট মোকাবিলা প্রশিক্ষণ এই প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের লক্ষ্য হলো সব পুলিশ সদস্যকে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা। ২০২২ সালে যেখানে প্রায় ১৪ হাজার কর্মকর্তা এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ২২ হাজার ৩৬০ জনে পৌঁছেছে। এটি বিভাগের মোট ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
বর্তমানে চার দিনের এই প্রশিক্ষণ কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথম ধাপে সংকটে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে এবং কীভাবে উত্তেজনা কমাতে হবে তা শেখানো হয়। গত বছর এতে নতুন একটি প্রশিক্ষণ যুক্ত হয়েছে, যেখানে আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়া অন্য অস্ত্রধারী ব্যক্তির সঙ্গে কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে তা শেখানো হয়।
দ্বিতীয় ধাপে মানসিক স্বাস্থ্য আইন সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে অভিনয়শিল্পীদের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতির অনুকরণ করে অনুশীলনও করানো হয়। তৃতীয় ধাপে আরও বিভিন্ন মানসিক সংকট পরিস্থিতির অনুশীলন করানো হয়, যেমন ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা, উদ্বেগজনিত ব্যাধি বা মানসিক আঘাত-পরবর্তী চাপজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। চতুর্থ ধাপে বুদ্ধিবিকাশজনিত সমস্যা, অটিজম, অসামাজিক ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্য এবং স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে তা শেখানো হয়।
এছাড়াও জোরপূর্বক মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার জন্য কাউকে হাসপাতালে নেওয়া, সংকট পরিস্থিতিতে কৌশলগতভাবে কাজ করা এবং মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে নিরাপদে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলাদা প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
Publisher & Editor