রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

হাঁটার কৌশল বদলালে কমতে পারে হাঁটুর ব্যথা, বলছে গবেষণা

প্রকাশিত: ০৭:০৩, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫

হাঁটুর বাত বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ব্যথা কমাতে ওষুধ, ইনজেকশন কিংবা অস্ত্রোপচারের বিকল্প হিসেবে হাঁটার ধরন পরিবর্তনের একটি সহজ পদ্ধতি আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। দ্য ল্যানসেট রিউমাটোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পায়ের অবস্থান বা কোণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হাঁটার অভ্যাস পরিবর্তন করলে দীর্ঘমেয়াদে হাঁটুর ব্যথা কমতে পারে। একই সঙ্গে হাঁটুর তরুণাস্থির ক্ষয় ধীর হওয়ারও কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এক বছর পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ব্যক্তিভেদে নির্ধারিত পায়ের অবস্থান অনুসরণ করে হাঁটার প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিদের হাঁটুর ব্যথা প্লাসিবো বা কার্যকর চিকিৎসার মতো নয়—এমন একটি নিয়ন্ত্রণমূলক পদ্ধতি গ্রহণকারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতিতে ব্যথা কমার মাত্রা কিছু বহুল ব্যবহৃত ওষুধের উপকারের সঙ্গে তুলনীয়। তবে এর সম্ভাব্য বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু ব্যথা উপশমের পরিবর্তে হাঁটার সময় হাঁটুর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর লক্ষ্যেও কাজ করে। এই অতিরিক্ত চাপ অস্টিওআর্থ্রাইটিসের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

হাঁটুর বাতের ব্যথা কেন হয়?

৪০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের প্রায় ২২ শতাংশ অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত। এটি শারীরিক অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ। এ রোগে ধীরে ধীরে হাড়ের প্রান্তে থাকা তরুণাস্থি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তরুণাস্থি হাড়ের দুই প্রান্তের মধ্যে কুশনের মতো কাজ করে এবং জয়েন্টের নড়াচড়া সহজ রাখে।

তরুণাস্থি ক্ষয়ে গেলে হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা কিংবা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর মতো সাধারণ কাজেও ব্যথা হতে পারে। ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ওষুধের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও ক্ষয়ে যাওয়া তরুণাস্থি নির্ভরযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারে—এমন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা এখনো নেই। রোগের অবস্থা গুরুতর হলে কারও কারও হাঁটু প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।    

এ অবস্থায় নতুন সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এসেছে ‘গেইট রিট্রেনিং’ বা হাঁটার ধরন পুনঃপ্রশিক্ষণ পদ্ধতি। এতে শুধু ব্যথা কমানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে হাঁটার সময় পায়ের অবস্থান ও শরীরের গতিবিধিতে পরিবর্তন আনা হয়, যাতে হাঁটুর ঝুঁকিপূর্ণ অংশে চাপ কম পড়ে।

কী বলছে গবেষণা?

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহ, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা যৌথভাবে এ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত গবেষণাটি হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ব্যক্তিভেদে নির্ধারিত হাঁটার প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা যাচাইয়ে প্রথম র‌্যান্ডমাইজড, প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে এক বছর ধরে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গবেষণার সহ-প্রধান ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহর জন অ্যান্ড মার্সিয়া প্রাইস কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্কট উলরিচ। এতে স্ট্যানফোর্ড ও নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষকেরাও যুক্ত ছিলেন। গবেষণাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি গবেষণা সংস্থার সহায়তা ছিল এবং অর্থায়নকারী হিসেবে দেশটির ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স বিভাগকে উল্লেখ করা হয়েছে।

উলরিচ বলেন, অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাঁটুর ওপর অতিরিক্ত চাপ রোগের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পারে—এ বিষয়ে গবেষকেরা আগে থেকেই জানেন। পায়ের কোণ পরিবর্তনের মাধ্যমে হাঁটুর ওপর চাপ কমানোও সম্ভব। তবে এ ধরনের জৈবযান্ত্রিক পদ্ধতির কার্যকারিতা প্রমাণে আগে র‌্যান্ডমাইজড ও প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত গবেষণার ঘাটতি ছিল।

গবেষকদের এই পর্যবেক্ষণ হাঁটুর বাতের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও পায়ের অবস্থান পরিবর্তন করে হাঁটা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া নিজের হাঁটার ধরন পরিবর্তন না করে ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

সূত্র: সাইন্স ডেইলি 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor