মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের সামনে বিরল কূটনৈতিক সুযোগ

প্রকাশিত: ০৬:৪০, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন প্রতিবছরই আসে। রাষ্ট্রনেতারা নিউইয়র্কে যান, ভাষণ দেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন, কিছু প্রস্তাব পাস হয়, অনেক প্রতিশ্রুতিও উচ্চারিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এবারের ৮১তম অধিবেশনকে সেই পরিচিত ছকে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এবারের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ ২২–২৯ সেপ্টেম্বর, সাধারণ বিতর্ক চলবে ২২–২৬ ও ২৮ সেপ্টেম্বর। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন সামলানো এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা’।

বাংলাদেশের একজন নাগরিকের সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব নিঃসন্দেহে বিরল কূটনৈতিক অর্জন। ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পান ৯১ ভোট। ফলে এটি কেবল আঞ্চলিক পালাবদলের আনুষ্ঠানিক ফল ছিল না, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে অর্জিত একটি পদ।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা বোঝা দরকার। সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অধিবেশন পরিচালনা করেন না, তিনি ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তাঁকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হয়, ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করতে হয় এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনার জায়গা তৈরি করতে হয়।

ফলে এই পদকে বাংলাদেশের জাতীয় দাবি আদায়ের সরাসরি হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এর বড় মূল্য অন্যত্র—বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে অস্বাভাবিকভাবে দৃশ্যমান। ঢাকা যদি এই দৃশ্যমানতাকে পরিণত, সংযত ও পরিকল্পিত কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একটি ‘কূটনৈতিক জানালা’ খুলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব করছেন, তখন পৃথিবীর দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে কিছুটা বেশি পড়বে—এটি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মনোযোগ নিজে কোনো অর্জন নয়। কূটনীতির আসল পরীক্ষা হলো সেই মনোযোগকে কতটা জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জনকল্যাণের পক্ষে ব্যবহার করা যায়। ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সামনে সেই বিরল পরীক্ষাই এসেছে।
এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে ফিরে আসা উচিত রোহিঙ্গা সংকট। তবে শুধু ‘রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে’—এই পরিচিত বাক্যে আটকে থাকলে চলবে না। ৮ বছরের বেশি সময় ধরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করার পর বাংলাদেশের এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন—প্রত্যাবাসনের বাস্তব কর্মপরিকল্পনা কোথায়?

রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব কার? মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কেন ক্রমেই অনিশ্চিত হচ্ছে? এবং এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, মানব পাচার, অপরাধ ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মূল্য কে বহন করবে?

গত বছরের ৮০তম অধিবেশনেই রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন করেছিল এবং স্বীকার করেছিল যে বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল এই বোঝা বহন করতে পারে না। এই স্বীকৃতিকে এবার ঘোষণার স্তর থেকে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপে নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বক্তব্য হওয়া উচিত মানবিক কিন্তু দৃঢ়—প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই হতে হবে, কিন্তু ‘পরিস্থিতি অনুকূল নয়’ কথাটি যেন স্থায়ী অজুহাতে পরিণত না হয়।

বাংলাদেশের জন্য এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ইস্যু সম্ভবত স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ। বর্তমান সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের বের হওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ করেছে এবং জাতিসংঘের উন্নয়ননীতি কমিটি মনে করেছে, কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের অগ্রগতির শর্তে সময় বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদের পদক্ষেপও প্রয়োজন হতে পারে।

তাই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণকে শুধু জাতীয় সাফল্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন না করে ‘মসৃণ উত্তরণ’-এর প্রশ্নটিও তুলতে হবে। কারণ, উত্তরণের সঙ্গে শুল্কসুবিধা, ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত সুবিধা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং কিছু বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন জড়িত। বাংলাদেশের চাওয়া হতে পারে—উত্তরণ যেন কোনো দেশের উন্নয়ন-অর্জনের জন্য শাস্তিতে পরিণত না হয়।

জাতিসংঘ বাণিজ্যচুক্তি করার জায়গা নয়। কিন্তু নিউইয়র্ক সেই রাজনৈতিক জায়গা, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারত, কানাডা এবং অন্যান্য বাজার ও উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য-সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা যায়। তাই প্রধানমন্ত্রীর সফরে ভাষণের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সূচিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের আরেকটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ক্ষেত্র হতে পারে অভিবাসন। লাখ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করেন; তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভগুলোর একটি। অথচ আন্তর্জাতিক অভিবাসন আলোচনায় বাংলাদেশের বক্তব্য অনেক সময় প্রবাসী আয়ে এসে থেমে যায়। এবার আলোচনাকে এগিয়ে নিতে হবে অভিবাসীর অধিকার, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, মজুরি চুরি, দক্ষতার স্বীকৃতি, সামাজিক সুরক্ষার বহনযোগ্যতা, নিরাপদ অভিবাসনপথ এবং প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসীদের পুনরায় একীকরণের দিকে।

বাংলাদেশ চাইলে ‘শ্রমিক-প্রেরণকারী দেশ’ পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শ্রমবাজার নিয়ে কথা বলতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও জনমিতিক পরিবর্তনে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে শ্রমের চাহিদা বদলাচ্ছে। বাংলাদেশের দরকার বাজারনির্ভর দক্ষতা কূটনীতি—শুধু মানুষ পাঠানো নয়, দক্ষতা নিয়ে অংশীদারত্ব তৈরি করা।

২০২৫ সালের ৮০তম অধিবেশন ছিল জাতিসংঘের ৮০ বছর পূর্তির অধিবেশন। এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘একসঙ্গে আরও ভালো: শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের জন্য ৮০ বছর এবং তার পরেও’। তখন বাংলাদেশে ছিল অন্তর্বর্তী সরকার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তর আন্তর্জাতিক আগ্রহের বড় বিষয় ছিল।

২০২৬ সালে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশে নির্বাচিত সরকার রয়েছে; প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের কাছ থেকে এবার শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিবরণ নয়, পরবর্তী পাঁচ বা দশ বছরের বৈদেশিক নীতি ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনাও শুনতে চাইবে।

জাতিসংঘে একটি ভালো ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভাষণই কূটনীতি নয়। এবারের সফরের সাফল্য মাপতে হবে কয়েকটি বাস্তব ফল দিয়ে—রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও অর্থায়নে নতুন প্রতিশ্রুতি এল কি না; স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় রূপান্তরকালের সুবিধার জন্য সমর্থন তৈরি হলো কি না; নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্বের দরজা খুলল কি না; বাংলাদেশি অভিবাসীদের অধিকার ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণ নিয়ে অগ্রগতি হলো কি না এবং জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের দাবির পক্ষে কতটা জোট তৈরি হলো?

এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় থাকা উচিত—বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা, বহুপক্ষীয়তা ও উন্নয়ন কূটনীতির পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের ইস্যু—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বৈষম্য, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য—এর সঙ্গে যুক্ত করা।

৮১তম সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি মঞ্চ। একটি দৃশ্যমান—জাতিসংঘের বিখ্যাত সবুজ মার্বেলের বক্তৃতামঞ্চ। অন্যটি দৃশ্যের আড়ালে—করিডর, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, ছোট বৈঠককক্ষ এবং কূটনৈতিক দর-কষাকষির টেবিল। প্রথম মঞ্চে বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি সংক্ষিপ্ত, আত্মবিশ্বাসী ও বিশ্বমুখী বক্তব্য। দ্বিতীয় মঞ্চে প্রয়োজন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য।

বাংলাদেশের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব করছেন, তখন পৃথিবীর দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে কিছুটা বেশি পড়বে—এটি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মনোযোগ নিজে কোনো অর্জন নয়। কূটনীতির আসল পরীক্ষা হলো সেই মনোযোগকে কতটা জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জনকল্যাণের পক্ষে ব্যবহার করা যায়। ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সামনে সেই বিরল পরীক্ষাই এসেছে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor