দেশে রেহানা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত প্রভাবিত করতে ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ পাঠানোর অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আওলাদ হোসেন বর্তমানে ব্রিসবেনে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে তার মামলা আদালতে উঠলেও বিষয়টি মুলতবি করা হয়েছে। আগামীকাল বুধবার তার জামিনের আবেদন করার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে রেহানার মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় দুটি তদন্ত এখনো চলছে।
বাংলাদেশ পুলিশ আওলাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশও রেহানার মৃত্যুকে সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে। অস্ট্রেলীয় তদন্তকারীরা এর আগে বাংলাদেশে গিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে কাজ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের অভিযোগ, বাংলাদেশ পুলিশের সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে স্ত্রী হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা থেকে নিজের নাম সরানো এবং চলমান তদন্ত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ওই অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।
অবশেষে মঙ্গলবার কুইন্সল্যান্ড থেকে ৫১ বছর বয়সী আওলাদকে গ্রেপ্তার করে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। জানা গেফেডারেল পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই বছরে বাংলাদেশে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে একাধিকবার অর্থ পাঠিয়েছেন আওলাদ। সব মিলিয়ে এর পরিমাণ ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি।
ওই অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। তবে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের কমান্ডার স্টিফেন জে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কোনো সরকারি বা পুলিশ কর্মকর্তা ওই অর্থ গ্রহণ করেছেন কিংবা অর্থের কারণে তদন্তে কোনো প্রভাব পড়েছে—এমন প্রমাণ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং রেহানার মৃত্যুর তদন্তে বাংলাদেশ পুলিশের সহযোগিতা আগের মতোই রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঘুষের অভিযোগটি সামনে এসেছে রেহানার মৃত্যু নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলমান তদন্তের সূত্র ধরেই। তদন্তকারীরা মঙ্গলবার কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইন্সের দুটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করেন। একই সঙ্গে সিডনি ও ব্রিসবেনের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ও ব্যাংক হিসাবের নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলাটিকে ব্যতিক্রমী বলছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার জন্য বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ সংস্থাটি আদালতে নেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
আওলাদের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় আরো একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। রেহানার মৃত্যু সনদ জাল করে তাঁদের যৌথ মালিকানাধীন কুইন্সল্যান্ডের তিনটি সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। তবে আওলাদের আইনজীবী আদালতে দাবি করেছেন, মৃত্যু সনদটি জাল নয়। মামলাটি ব্রিসবেন জেলা আদালতে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক রেহানা স্বামী আওলাদ হোসেন ও সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছিলেন। তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৬ জুন কিশোরী মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে যান রেহানা। সেখানে তিনি তার বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িসহ স্বজনদের বাড়িতে ছিলেন। তার স্বামী আওলাদ হোসেন ২৯ জুন বাংলাদেশে যান। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অবস্থানকালীন ২০২৪ সালের ৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ হন রেহানা। নিখোঁজের ঘটনায় রেহানার মা আইরিন আক্তার ৩১ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ ও ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের পক্ষ থেকেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরে রেহানার বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। ৮ সেপ্টেম্বর রেহানার মা বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় অপহরণ ও নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে রেহানাকে অপহরণের অভিযোগ আনা হয়। তাঁদের মধ্যে স্বামী আওলাদ হোসেনও ছিলেন। তদন্তে পরে আরো একজনের নাম আসে।
মামলার তদন্তে রেহানার ননদ পাপিয়া আক্তার ও আমজাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ১২ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নয়াহাট মৌনদিয়া চৌরাপাড়া এলাকায় পাপিয়ার বাড়ির আঙিনা থেকে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটির নিচে মরদেহটি পুঁতে রাখা হয়েছিল।বাংলাদেশে চলমান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নুর খান পরে অস্ট্রেলিয়ার এবিসিকে জানান, পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী ৫ জুলাই রাত আটটা থেকে দশটার মধ্যে পাপিয়ার বাড়িতে রেহানাকে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে, বালিশ দিয়ে মুখ চেপে তাঁকে হত্যা করার বিষয়সহ ঘটনার সময় রেহানার স্বামী আওলাদ বাংলাদেশেই অবস্থান করার বিষয়টি সামনে অাসে। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জুন বাংলাদেশে যান অাওলাদ এবং ১৩ জুলাই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসেন।
রেহানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার সূত্রে ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা পুলিশ সংবাদ সম্মেলন সূত্রে জানা গেছে, রেহানাকে হত্যা ও মরদেহ গুমের ঘটনায় স্বামী আওলাদের যোগসাজশ ছিল। রেহানার মা আইরিন আক্তারও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে অাওলাদসহ তার স্বজনরা মিলে তাঁর মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। ওই মামলায় বাংলাদেশে আওলাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে অাদালত। রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ অাওলাদসহ তার স্বজনদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিষয়টি চলতি বছরের মে মাসে ব্রিসবেনের একটি আদালতকে জানান সংশ্লিষ্টরা। এরপর রেহানার মৃত্যু নিয়ে তদন্তে নামে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। অস্ট্রেলিয়ার বাইরে কোনো অস্ট্রেলীয় নাগরিক বা বাসিন্দাকে হত্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দেশটির ফেডারেল আইনের অধীনে তদন্তটি চলছে। রেহানার মৃত্যুর সেই তদন্ত থেকেই এবার নতুন করে সামনে এসেছে ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়ে তদন্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ। সেই অভিযোগেই মঙ্গলবার কুইন্সল্যান্ডে গ্রেপ্তার হলেন আওলাদ হোসেন।
Publisher & Editor