আদানি পাওয়ারের ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
একদিকে ভাঙা ঘর, উচ্ছেদ হওয়া পরিবার, অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ প্রকল্প। আসামের ধুবড়ি জেলার চাপরে এই দুই ছবিই এখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
যে জমি থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা হয়েছিল, রোববার সেই জমিতেই আদানি পাওয়ারের ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
প্রকল্পটির জন্য বিনিয়োগ করা হবে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। আদানি গোষ্ঠীর দাবি, নির্মাণপর্বে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্প চালু হলে আরও প্রায় ৫ হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। প্রথম ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০৩০ সালের ডিসেম্বর থেকে। কিন্তু বড় প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পের জমি নিয়ে।
ধুবড়ির চারুয়াবাখরা, চিরাকুটা এক ও দুই এবং সন্তোষপুর এলাকায় প্রায় ১ হাজার ১৫৭ একর সরকারি জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন বহু পরিবার। উচ্ছেদের সময় স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই তিন থেকে চার দশক ধরে সেখানে বসবাস করছেন।
অনেক পরিবার আবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে পূর্বের বসতভিটা হারিয়ে ওই এলাকায় এসে বসতি গড়েছিল। উচ্ছেদের পর প্রায় ১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, প্রকল্পের জন্য সরকারি জমি আগে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই জমি আদানি পাওয়ারের প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
প্রশাসন ৩০০ বিঘা জমি অন্য এলাকায় পুনর্বাসনের জন্য চিহ্নিত করে এবং মালপত্র সরানোর জন্য পরিবারপিছু ৫০ হাজার টাকা সহায়তার কথা জানায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশ সেই পুনর্বাসনস্থানে যেতে রাজি হননি।
তাদের অভিযোগ, ব্রহ্মপুত্রঘেরা নিচু এলাকায় বর্ষায় পানি ঢোকে এবং সেখানে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাও নেই। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদনে আদানি পাওয়ার কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল, প্রকল্প এলাকায় কোনো জনবসতি নেই এবং পুনর্বাসন বা পুনর্বাসনজনিত ক্ষতিপূরণের দাবি নেই।
অথচ উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর বক্তব্য, তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে প্রকল্পের জমি পরিষ্কার করা হয়েছিল। স্থানীয় এক বাসিন্দার দাবি, সরকারি জমির পাশাপাশি জমির অধিকারপত্র থাকা মানুষের জমিও নেওয়া হয়েছে এবং তাদের বড় একটি অংশ এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ জেলা প্রশাসন গ্রামের চারণভূমি প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়। ২ এপ্রিলের জেলা পর্যায়ের ভূমি সংক্রান্ত বৈঠকের কার্যবিবরণীতেও সেই প্রস্তাবের উল্লেখ রয়েছে। এরপরই উচ্ছেদের নোটিশ জারি হয় এবং ঘরবাড়ি ভাঙা শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পকে আসামের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তার দাবি, ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের এই প্রকল্প রাজ্যের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা নেবে।
আদানি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প হয়ে উঠবে। তবে উন্নয়নের এই হিসাবের পাশে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর হিসাবটি এখনও মেলেনি। একদিকে বিদ্যুতের আলো জ্বালানোর প্রস্তুতি, অন্যদিকে সেই আলো পৌঁছানোর আগেই ঘর হারানো মানুষের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন। ফলে ধুবড়িতে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে—উন্নয়নের জমির দাম শেষ পর্যন্ত দেবে কে।
Publisher & Editor