বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হার নয়, মেয়েদের ফুটবলে সংকটটা আরো গভীরে

প্রকাশিত: ০১:৪৭, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |

উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলের হারকে শুধু একটি ম্যাচের ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে এই ব্যবধান বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বাস্তব চিত্রটাই সামনে এনেছে।

প্রশ্নটা তাই শুধু কোচ কে, একাদশে কে খেলল কিংবা কৌশল কী ছিল—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, আমরা আসলে কিভাবে এই দলটাকে তৈরি করছি?
বাংলাদেশের নারী ফুটবলে দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা—প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লিগ নেই। প্রতিবছর যে লিগ হয় সেটা নামকাওয়াস্তে। তাই জাতীয় দলের প্রস্তুতি অনেকটাই নির্দিষ্ট একটি খেলোয়াড়গোষ্ঠী, ক্যাম্প আর আন্তর্জাতিক ম্যাচকেন্দ্রিক। ফলে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার জন্য নিয়মিত প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না।

একজন খেলোয়াড়ের জায়গা নেওয়ার জন্য আরেকজনকে যদি নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগই না দেওয়া হয়, তাহলে জাতীয় দলের জায়গার লড়াই তৈরি হবে কিভাবে?

নতুন খেলোয়াড় আনার প্রধান পথ এখন অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ দল। কিন্তু সেখান থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের সিনিয়র পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করার নিয়মিত মঞ্চ নেই। ফলে একই খেলোয়াড়দের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জাতীয় দলের আশপাশে রাখার প্রবণতা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

খেলোয়াড়দের থাকা-খাওয়ার পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন আছে। বাফুফে ভবনে সাত-আটজন খেলোয়াড়কে একটি কক্ষে গাদাগাদি করে থাকার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। জীর্ণশীর্ণ ও অস্বস্তিকর পরিবেশে থেকে এশিয়ান কাপ বা এশিয়ান গেমসের মতো আসরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত?

উচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে অনুশীলনের পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম, পুনর্বাসন ও চিকিৎসা-সহায়তা। একজন খেলোয়াড়ের উন্নয়নকে তাই শুধু মাঠের অনুশীলন দিয়ে বিচার করা যায় না। সে কোথায় থাকছে, কী খাচ্ছে, কিভাবে বিশ্রাম নিচ্ছে—এসবও পারফরম্যান্সের অংশ।

এখানেই একটি কাঠামোবদ্ধ নারী লিগের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ১০ দলের একটি প্রতিযোগিতামূলক লিগ হতে পারে সেই পথের শুরু। প্রতিটি দলে জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের সংখ্যা সীমিত রাখা গেলে ক্লাবগুলোকে তরুণ খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। বাড়বে জায়গা পাওয়ার লড়াই। জাতীয় দলের কোচের হাতেও তৈরি হবে বড় খেলোয়াড় পুল।

আর্মি, পুলিশ ও বিকেএসপির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে নারী ফুটবলার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এগুলোকে একটি সুসংগঠিত উন্নয়ন-ব্যবস্থার অংশ করা গেলে জাতীয় দলের জন্য নিয়মিত খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব। একজন খেলোয়াড় জাতীয় দলের ক্যাম্পে আসার পর তাকে তৈরি করার চেয়ে ক্লাব পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা অনেক বেশি কার্যকর।

সমস্যা শুধু খেলোয়াড় তৈরিতেও নয়, কোচিং কাঠামোতেও প্রশ্ন আছে। লাইসেন্স পাওয়ার পর একজন কোচ দীর্ঘদিন মাঠে কাজ না করেও একই অবস্থায় থাকবেন—এমন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিও ভাবার সময় এসেছে। কোচদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স উন্নয়ন, মাঠে অনুশীলন পরিচালনা ও ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার।

সবচেয়ে বড় কথা, নারী ফুটবলের উন্নয়ন কোনো এক ব্যক্তি, একটি বয়সভিত্তিক দল কিংবা শুধু জাতীয় দলের ক্যাম্পের ওপর নির্ভর করে হতে পারে না। দরকার একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন-ধারা—স্কুল ও একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে আসবে, অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ পেরিয়ে সিনিয়র ক্লাব ফুটবলে খেলবে, সেখান থেকে জাতীয় দলে জায়গার জন্য লড়াই করবে।

উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলের হার সেই কাঠামোর দুর্বলতাগুলো আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। কোচ বদলালে একাদশ বদলাবে, কৌশল বদলাবে। কিন্তু খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক লিগ, কোচিং কাঠামো এবং খেলোয়াড়দের জীবনযাপনের মৌলিক পরিবেশ না বদলালে এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমানো কঠিন।

বাংলাদেশ নারী ফুটবলকে তাই শুধু পরের ম্যাচের জন্য নয়, পরের প্রজন্মের জন্যও প্রস্তুত হতে হবে।

আর সেই প্রস্তুতির প্রথম শর্ত হতে পারে—নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক নারী লিগ এবং খেলোয়াড়দের জন্য একটি সম্মানজনক জীবনযাপনের পরিবেশ।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor