জারিনের হিরু মামা এসেছে ফিনল্যান্ড থেকে। এসেই দেখে, গালে হাত দিয়ে বসে আছেন দুলাভাই।
‘বুঝলি জারিন! পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশের পাসপোর্ট পেয়েছি! দুলাভাইকে ধরে ফিনল্যান্ডে নিয়ে গেলে জাদুঘরে রাখা যাবে। সেখানে এমন বিমর্ষ মানুষ নেই।’
‘সুখের দেশ ছেড়ে এলে কেন?’
‘এই দেশের মানুষ অনেক দুঃখী, তাদের সুখী করতে হবে।’
‘বাবার একটা গতি করো আগে।
ডিলারশিপের ব্যবসা নিয়ে পাগল হওয়ার দশা। আবার ঢাকা যাচ্ছে মাসখানেকের জন্য।’
‘দুলাভাই কেস পরে, আগে গ্রামের মানুষকে সুখী করতে হবে। দুঃখী মানুষের তালিকা করা দরকার।
‘ঠিক আছে মামা। কারেন্ট থাকতে থাকতে ঘুমাও। বিদ্যুৎ গেলে সুখও পালাবে।’
জারিনদের বনেদি বাড়ি। হিরুর ঘরের ঝুলঝাড় ধোয়ামোছা করলেন একাব্বর মিয়া।
মুখ দেখে মনে হয়, রাজ্যের সুখে আছেন তিনি। টুকটাক কাজ করেন আর গল্পের বই পড়েন। আপাতত ফিনল্যান্ডের গল্প শোনার চেষ্টা করছেন হিরুর কাছ থেকে। হিরুর ঝুলিতে বিশেষ গল্প নেই। ওই দেশে মাইলের পর মাইল লোকই নেই। গল্প হবে কী করে।
‘নিশ্চিন্তে ঘুমান হিরু মিয়া, ডরাইয়েন না।’
ঘাবড়ে গেল হিরু। ভয় পাওয়ার মতো কিছু আছে?
’কেন চাচা?’
’ওরা বেশি ডিশটাব করে না।’
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ভূতে ভয় পাওয়া যাবে না, এমনটা মানতে নারাজ হিরু। অবশ্য পনেরো ঘণ্টার বিমান জার্নির কাছে হার মানল ভূতের ভয়। ঘুমিয়ে গেল হিরু।
ধুপ!
‘উফ!’
পিঠে আধসের ওজনের কিল।
‘আরেকটু ঘুমাই রে, এখনো সকাল হয়নি।’
ধুপধাপ।
‘কী মুশকিল!’
পাশ ফিরতেই জমে গেল হিরু। কেউ নেই! অথচ পিঠ টনটন করছে।
‘ব্যথা পাইছেন?’
‘জি, অবশ্যই।’
‘আরেকটু আস্তে মারার দরকার ছিল। স্যরি। ডরাইছেন স্যার?’
‘কে আপনি?’
‘আমি কিলকিলে ভূত। কথায় আছে না, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। আমি সেই গোত্রের ভূত।’
‘সুখী মানুষ কী দোষ করল!’
‘স্যার, কিছু মনে করবেন না। আমার মেয়েটার খুব শখ আপনাকে একটা কিল দেবে। একটু উপুড় হয়ে শোন।’
‘অসম্ভব!’
রিনরিনে কণ্ঠে কে যেন বলল, ‘থাক বাবা, উনাকে কিল দেব না। উনি ভালো।’
‘ঠিক আছে! এই পাশ ফিরে শুলাম। আস্তে দিয়ো।’
টুস করে একটা কিল পড়ল।
‘মেয়ের গায়ে দেখি জোর নাই। ঠিকমতো খায় না? আমার কাছে শুকনো ক্লাউডবেরি আছে। খাবে?’
‘আমাদের খাদ্য মানুষের সুখ। সুখী মানুষ কিলিয়ে আমাদের মন ভরে। কিন্তু গ্রামে সুখী মানুষের আকাল।’
হিরু ভাবল, ঘটনা গুরুতর। সুখী মানুষের অভাবে ভূতশিশুরা অভুক্ত থাকবে, এটা মানা যায় না। মানুষ পরে, আগে গ্রামের ভূতদের সুখী করা চাই।
সকালে ব্যাপারটা জানল জারিন। অন্যদের মতো উড়িয়ে দিল না। এআইকে জিজ্ঞেস করল, ‘দেশে সুখী মানুষের তালিকা কোন অধিদপ্তরে গেলে জানা যাবে?’
সোজা উত্তর দিল না এআই। ঘুরিয়ে বলল, ‘সুখ বিষয়টা জটিল। কার সুখ যে কিসে বলা মুশকিল।’
এগ্রাম-ওগ্রাম থেকে খবরটা গোটা ইউনিয়নে ছড়িয়ে গেল। বলাবলি হচ্ছে, জারিনদের বাড়ির ভূতরা সুখী মানুষদের কিলাচ্ছে।
নিজে সুখে আছে কি নেই, সেটা জানার হিড়িক পড়ে গেল। দিনে-রাতে জারিনদের বাড়িতে ধরনা দিতে থাকল কেউ না কেউ।
‘ভাইজান, আমি সুখী কি না টেস্ট করব। একটু কিলাইতে বলেন।’
‘পিঁড়িতে পিঠ খাড়া করে বসুন।’
‘কেউ তো কিলায় না।’
‘তার মানে আপনি সুখী না।’
‘হইতে পারে। এক মাস ধইরা রোমানিয়ার ভিসা হয় না। দূর!’
এলো হারু মাঝি। সকালে নৌকা চালায়, বিকেলে ঘুরে ঘুরে গাছ লাগায়। সে বসতেই কয়েকটা কিল পড়ল পিঠে।
‘বাহ, আরাম তো! আরো কয়েকটা কিল দেন গো ভূত সাব। এই কিলে সুখ আছে।’
হিরুর বড় খালা এসেছেন। সকাল থেকে পিঁড়িতে বসে আছেন। একটা কিলও পড়ছে না।
‘আমার ত্রিশ ভরি সোনা, দশ বিঘা জমি, উত্তরায় ফ্ল্যাট। বড় ছেলে সুইডেনে। ছোটটা কানাডায়। আমি কোন আক্কেলে দুঃখী! সব হিরুর ভণ্ডামি।’
‘খালা, ইয়ে...মানে, সত্যিকারের সুখে না থাকলে ভূতরা কিলাবে না। ছেলেমেয়েরা আপনার খোঁজখবর কম নেয়। বোধ হয় সেই কারণে..।’
বড় খালা সেদিনই দুঃখী মনে বিদায় নিলেন।
ব্যবসায়ীদের অনেকে কিল না খেয়ে হতাশ। অনেকে ব্যাপারটা মানতে নারাজ।
‘আমার ব্যাংকে এত টাকা, আমি সুখী না কেন!’
হিরু বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘টাকা থাকলেই সুখী হয় না। আবার টাকা ছাড়াও সুখে থাকা যায়।’
কেউ কিল খেল, কেউ খেল না। সুখ নিয়ে গোটা এলাকায় যেন নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হলো।
রাতে হিরু গেল নদীর তীরে। নদীর জলমাখা শীতল বাতাস গায়ে লাগতেই আইডিয়াটা পেল।
পরদিন ঢাকঢোল জড়ো করা হলো। ভ্যানে চড়ে মাইকিং করা হবে। একটা ছড়া লিখেছে জারিন।
‘ওহে প্রিয় গ্রামবাসী শোনো দিয়া মন। সুখী হওয়ার ফর্মুলা বলিতেছি এখন। নিজের কথা না ভাবিয়া, ভাবো অন্যের কথা। তবেই মিলিবে কিল, পাইবে না ব্যথা।’
বিষয়টা প্রথমে পরীক্ষা করলেন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। নিজের জমির ফসল গ্রামবাসীর মাঝে বিনা মূল্যে বণ্টনের ঘোষণা দিলেন। পিঁড়িতে বসতেই ধপাধপ কিল। কিল খেয়ে ফুরফুরে মন নিয়ে ঘুরছেন আর বলছেন, ‘বুঝলে! ভূতের কিল খেয়ে এলাম, হে হে!’
কারো তর সইছে না। আড়তদার বাতেনসহ অনেক ব্যবসায়ী ঘোষণা দিলেন, সপ্তাহে তিন দিন তাঁরা লাভ করবেন না। জিনিসপত্রের দাম গেল কমে। আহ! সবার পিঠে কী মধুর কিল!
উপকার করা নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড! হারু মাঝির কুঁড়েঘরের চালা মেরামত করে দিয়ে গেলেন হাই স্কুলের অঙ্ক স্যার। বিধবা রহিমার ঘর ভরে গেল খাবার আর কাপড়ে। কেউ কৃষকের ধান কেটে দিল, কেউ আগাছা পরিষ্কার করে দিল। যেকোনো মূল্যে ভূতের কিল খাওয়া চাই।
মানুষজন মহাসুখী। সন্ধ্যার পর কেউ আর মোবাইল ফোন হাতে বসে না। নদীর তীরে চলে খিচুড়ির পিকনিক। পালাগানের আসরও জমেছে বেশ। সবাই সবার খোঁজ রাখে। কারো মন খারাপ করে থাকার জো নেই।
মাসখানেক পর। রাতে হন্তদন্ত হয়ে ঢাকা থেকে ফিরলেন জারিনের বাবা। গ্রামের চেহারা দেখে তো অবাক। দুনিয়াজুড়ে এত অশান্তির মাঝেও সবাই এত ফুর্তিতে কেন বুঝতে পারছেন না।
রাতে হিরুর সঙ্গে চা খেতে খেতে বললেন, ‘তুমি নাকি ভূতের বাদশা। আমাকে একটা বুদ্ধি দাও দেখি।’
‘দুলাভাই, ডিলারশিপ ব্যবসা বাদ দেন। ভেষজ নার্সারি শুরু করেন। আপনার বৃক্ষপ্রীতি আছে। বিদেশে এসবের চাহিদাও ভালো।’
‘ভালো বুদ্ধি। পুদিনাপাতা আর মেস্তা ফল দিয়ে শুরু করি। আজকাল মেস্তার চা খুব চলছে।’
ব্যবসায় লস দিয়ে এসেও জারিনের বাবা এখন সুখী। ঘুমও পেয়েছে বেশ। নিজের ঘরের দিকে চললেন। যেতে যেতে হুট করে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই! কিল দেয় কে! এত বড় সাহস, আমাকে কিল দেয় কে!’
Publisher & Editor