মধুকে সাধারণত প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে এই ধারণা প্রযোজ্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক বছরের কম বয়সি শিশুকে কোনোভাবেই মধু খাওয়ানো উচিত নয়। কারণ মধু থেকে এ বয়সি শিশুর বিরল হলেও গুরুতর একটি রোগ—ইনফ্যান্ট বোটুলিজম—হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
মধুতে কী এমন আছে, যা শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?
মধুর মধ্যে কখনো কখনো ক্লোস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম নামের ব্যাকটেরিয়ার স্পোর থাকতে পারে। বড় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের পরিপাকতন্ত্র সাধারণত এসব স্পোরের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু এক বছরের কম বয়সি শিশুর পাচনতন্ত্র এখনও পুরোপুরি পরিণত হয় না।
ফলে শিশু মধুর মাধ্যমে এসব স্পোর গ্রহণ করলে তা অন্ত্রে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ক্ষতিকর নিউরোটক্সিন তৈরি করতে পারে। এই বিষ শরীরের পেশি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলেই দেখা দিতে পারে ইনফ্যান্ট বোটুলিজম।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি মধুর বোতলেই এই ব্যাকটেরিয়ার স্পোর থাকে বা মধু খেলে প্রতিটি শিশুই অসুস্থ হয়ে পড়বে। ইনফ্যান্ট বোটুলিজম একটি বিরল রোগ। তারপরও এক বছরের কম বয়সি শিশুর জন্য মধু কোনো প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে না। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে এ বয়সে মধু সম্পূর্ণ বাদ দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
মধুকে অনেক সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো কিংবা সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু শিশুর ক্ষেত্রে মূল উদ্বেগ মধুর চিনি বা মিষ্টতা নয়; বরং এতে থাকা সম্ভাব্য ব্যাকটেরিয়ার স্পোর।
বিশ্বজুড়েও দেখা যাচ্ছে রোগটির উপস্থিতি
শিশুদের বোটুলিজমের ঝুঁকিকে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ যে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক বৈশ্বিক তথ্যেও। Pediatrics জার্নালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮টি দেশে ২০০৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইনফ্যান্ট বোটুলিজমের ২ হাজার ৯৪৩টি নিশ্চিত ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেন এই রোগের জন্য দায়ী হতে পারে। এর মধ্যে টাইপ এ ও টাইপ বি বোটুলিনাম টক্সিনের ঘটনাই ছিল বেশি।
গবেষকদের মতে, ইনফ্যান্ট বোটুলিজম সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে এখনও সচেতনতা তুলনামূলক কম। অনেক জায়গায় রোগটি শনাক্ত করার সীমিত সক্ষমতার কারণে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া ঘটনাগুলোর চেয়েও বেশি হতে পারে।
শিশুর শরীরে কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে?
ইনফ্যান্ট বোটুলিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক লক্ষণ হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। অনেক সময় শিশুর স্পষ্ট দুর্বলতা দেখা দেওয়ার আগেই এই সমস্যা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
কোষ্ঠকাঠিন্য
খেতে বা দুধ পান করতে সমস্যা
দুর্বলভাবে কান্না করা
মুখের নড়াচড়া কমে যাওয়া
চোখের পাতা ঝুলে পড়া
মাথা ঠিকভাবে ধরে রাখতে না পারা
গিলতে সমস্যা হওয়া
বিষক্রিয়ার কারণে গিলতে ও শ্বাস নিতে ব্যবহৃত পেশিগুলোও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করার পাশাপাশি শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই এক বছরের কম বয়সি কোনো শিশুর মধ্যে অস্বাভাবিক দুর্বলতা, খাওয়ানোর সমস্যা, দুর্বল কান্না, কোষ্ঠকাঠিন্যের সঙ্গে দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
Publisher & Editor