শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

একলা মাল্টার কষ্ট

প্রকাশিত: ০৮:২২, ২১ আগস্ট ২০২৬ |

আমি হলাম মাল্টা। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের পাশে একটি বাগানে আমার জন্ম।

সেখানে আমার সঙ্গে অনেক বন্ধুও ছিল। ওদের সঙ্গে প্রতিদিন অনেক আড্ডা দিতাম। এক সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধু বলল, ‘ভাই, আমাদের আর বেশি সময় নেই। এই সপ্তাহ পুরো সময় আমাদের গল্প আর আড্ডা মারতে হবে।

কারণ পরের সপ্তাহে আমাদের তুলে নিয়ে যাবে। এরপর মানুষ আমাদের কিনে খেয়ে ফেলবে। আমাদের আর দেখা হবে না। তোমাকে এই কদিন প্রাণভরে দেখব।

আমাকে খেয়ে ফেলবে, এ কথা শুনে অনেক ভয় পেলাম। এ জন্য আমি বললাম, ‘যেহেতু মানুষ আমাদের খেয়ে ফেলবে, চলো, আমরা এখনই আড্ডা শুরু করি। আমরা সব বন্ধু মিলে গল্প করি।’

ওই এক সপ্তাহের আড্ডা খুব জমজমাট ছিল। শেষ দিন রাতে আমার অনেক ভয় করছিল।

ভয় ভুলে থাকতে রাত ২টা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে তারপর ঘুমাতে গেলাম। ঘুম ভাঙল সকাল ৯টায়।
আমার বন্ধু বলল, ‘আজ আমাদের তুলে নেবে। তুমি ভালো থেকো।’ আমিও বললাম, ‘তুমিও ভালো থেকো।’

একটু পর আমি দেখতে পেলাম লোকেরা বাগানে ঢুকে গাছ থেকে মাল্টাসব কাটতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে তারা আমার থেকে মাত্র দুই গাছ দূরে চলে আসে। আমার ভীষণ ভয় লাগছিল। দুই মিনিট পর আমাকে আর আমার বন্ধুকে গাছ থেকে কেটে নিয়ে ঝুড়ির মধ্যে রাখল। সেখানে পাঁচ মিনিট রাখার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো একটি রুমে। ১৫ মিনিট পর একটি লোক এসে ভালো মাল্টাগুলো বাছাই করে আলাদা করল। ওই সময় আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে বিদায় জানাই। কিছুক্ষণ পর আমাদের একটি বাক্সে ঢোকানো হলো। সেখানে প্রায় ৫০টি মাল্টা ছিল। ওদের সঙ্গে আমি ভাব জমালাম।

আচ্ছা, তোমরাও কি একই বাগানের?

মাল্টা ১ : হ্যাঁ। আমরা কেপটাউন বাগানের।

আমি : আমিও তো কেপটাউন বাগানের।

মাল্টা ১ : আসলেই?

আমি : হ্যাঁ।

মাল্টা ১ : সবাই শোনো। ও আমাদের বাগানেরই!

মাল্টা ২ : সত্যি?

আমি : হ্যাঁ। আচ্ছা, আমাদের এখন কোথায় নেওয়া হবে?

মাল্টা ৩ : মনে হয় ভারতীয় উপমহাদেশে।

আমি : তাহলে আমাদের ভারতীয় মানুষ খাবে?

মাল্টা ৩ : ঠিক জানি না। তবে তুমি যদি পচে যাও তাহলে আর খেতে পারবে না।

আমি : তাহলে তো বেশ ভালো!

মাল্টা ৪ : পচে গেলে খাবে না?

মাল্টা ৩ : না, খাবে না।

আমি : তাহলে তো পচে গেলেই ভালো।

মাল্টা ৪ : হ্যাঁ।

মাল্টা ২ : ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছতে কত সময় লাগবে?

মাল্টা ১ :  জানি না।

মাল্টা ৫ : হয়তো কয়েক দিন লাগবে!

মাল্টা ৪ : তাহলে চলো আমরা গল্প করি আর ঘুমাই।

মাল্টা ৫ : ঠিক আছে, চলো।

আমি : তাহলে গল্প শুরু করা যাক।

আমাদের গল্প ভালোই জমেছিল। গল্পে গল্পে অনেক সময় পার হয়েছে। একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম। আমি যে বাক্সে ছিলাম, সেটি একজন খুলল। ওমা! সবাই দেখি বাঙালি! আমাদের সঙ্গে অন্য যাদের রাখা হয়েছে তারা কেউ ভারতের, কেউ ভুটানের। আর আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার তো আছিই। সেখানে আমি আমার কয়েকজন বন্ধুকেও দেখতে পেলাম। তাদের দেখে আমি অনেক খুশি হলাম।

কিছুক্ষণ পর আমাদের রাস্তার একটি ভ্যানে রাখা হলো। পাশে সফেদা, আপেল, জলপাই আর বরই ছিল। ধীরে ধীরে মানুষেরা সেসব কিনে নিয়ে যাচ্ছিল। একটু পর ভ্যানের পাশে এলো একজন মহিলা। তার সঙ্গে একটি বাচ্চা। সে মাল্টা খেতে চাইল। মহিলাটি ২০০ গ্রাম জলপাই আর তিনটি মাল্টা কিনল। সেখানে ছিল আমার বন্ধু। আমার মন অনেক খারাপ হয়ে গেল।

এরপর এলো একজন মধ্যবয়সী লোক। বয়স ৫৫ বছর হবে। সে আমাকেসহ কয়েকটি মাল্টা আর আপেল কিনল। কিনে ব্যাগে ঢোকাল। আমার খুব ভয় করছিল। কারণ একটু পর আমাকে খেয়ে ফেলবে।

কিছুক্ষণ পর লোকটির বাসায় পৌঁছলে সঙ্গে সঙ্গে একটি ছোট ছেলে এলো। একটি ঝুড়ির ওপর আমাদের সাজিয়ে রাখল। দেখা গেল, ধীরে ধীরে আমার বন্ধুদের খেয়ে ফেলা হয়েছে। বাকি ছিলাম আমি আর দুটি আপেল। এর মধ্যে অনেক দিন কাটল। কেউ আমাদের দিকে ফিরে চাইল না। ওই বাসায় মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ত লেজওয়ালা একটি প্রতিবেশী। একদিন ওই লেজওয়ালা প্রতিবেশী আমার পাশে থাকা দুটি আপেল নিয়ে পালাল। আমি তখন সম্পূর্ণ একা হয়ে যাই। সারা দিন বসে থাকি। বাসার সবার কাজ দেখি। আর বেশিদিন নেই, আমি পচে যাব...!

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor