ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের গুরুত্বপূর্ণ ই১ এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০টি নতুন বসতি বাড়ি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও কানাডা।
বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো ইসরায়েলের এই পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলকে পরিকল্পনাটি অবিলম্বে বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ আন্তর্জাতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতিকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে ইসরায়েল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। ই১ এলাকায় বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক চাপ ও বিরোধিতার কারণে আটকে ছিল। নতুন করে এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগে ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও কানাডার যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে এরই মধ্যে গুরুতর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চলছে।
সেখানে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি অর্থনীতির ওপরও কঠোর বিধি-নিষেধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা আরো উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে দেশগুলো। বিবৃতিতে বলা হয়, এই পরিকল্পনা শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরো দূরে সরিয়ে দেবে না, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থানকেও আরো দুর্বল করবে।
জাতিসংঘের মহাসচিবও আলাদা এক বিবৃতিতে ই১ প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, এই পরিকল্পনা একটি সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ‘অস্তিত্বের হুমকি’ তৈরি করেছে। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাড মিলিব্যান্ডও ই১ পরিকল্পনার সমালোচনা করেন। জবাবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।
ইসরায়েলের আবাসন মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, মোট ৩ হাজার ৪০১টি আবাসন ইউনিটের মধ্যে ১ হাজার ২৩৪টির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। গত আগস্টে ইসরায়েল সরকার এসব আবাসন ইউনিট নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। প্রকল্পটির আওতায় পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের মধ্যবর্তী প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা রয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৯ অক্টোবর। এর মাত্র কয়েক দিন পর, ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে নির্বাচনের পর নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় এলেও ইতিমধ্যে দেওয়া দরপত্র বাতিল করা তার জন্য কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন প্রকল্পটির বিরোধীরা।
ই১ প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার সময় ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ বলেছিলেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা ‘মুছে ফেলা হচ্ছে’। স্মোটরিচ ইসরায়েলের কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত নেতা। তিনি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদেরও শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে পরিচিত। বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে থাকা ইসরায়েলি নেতাদের মতে, পশ্চিম তীর ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। তবে ফিলিস্তিনিরা ও ইসরায়েলের অনেক মিত্র দেশ মনে করে, নতুন বসতি নির্মাণ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরো কঠিন করে তুলবে।
ই১ এলাকা পশ্চিম তীরের মাঝামাঝি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। এর একদিকে রয়েছে পূর্ব জেরুজালেম, অন্যদিকে মালে আদুমিমসহ ইসরায়েলি বসতি। এই এলাকায় বড় আকারে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পটির বিরোধীরা বলছেন, এর ফলে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পূর্ব জেরুজালেমও পশ্চিম তীরের অন্যান্য ফিলিস্তিনি এলাকার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এ ছাড়া পশ্চিম তীরের কেন্দ্রীয় অংশে একটি সংযুক্ত ফিলিস্তিনি শহরাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই শহরাঞ্চলের মাধ্যমে রামাল্লাহ, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ই১ এলাকায় বসবাসকারী বেদুইন ফিলিস্তিনিরা এবং ইসরায়েলের কয়েকটি শান্তিকামী সংগঠন এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন বসতি নির্মাণের ফলে ওই এলাকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের জীবন ও চলাচল আরো কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে নতুন নির্মাণকাজের কারণে তাদের বসবাসের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। ফিলিস্তিনিরা এসব এলাকা এবং গাজা উপত্যকাকে নিয়ে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসরায়েলের দখলের পর থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি বসতি গড়ে উঠেছে। এসব বসতিতে প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বসবাস করছে। একই এলাকায় প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনিও বসবাস করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক বিরোধিতা থাকলেও একের পর এক ইসরায়েলি সরকার এসব বসতি সম্প্রসারণের অনুমোদন দিয়েছে।
২০২২ সালের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফেরার পর পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের গতি আরো বেড়েছে। নেতানিয়াহু ডানপন্থী ও বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থন পাওয়া একটি জোটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেন। তার সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধের মধ্যেও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
ই১ প্রকল্পের বিরোধীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে। তাদের মতে, ই১ এলাকায় বড় ধরনের বসতি গড়ে উঠলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাবে। ফলে একটি ধারাবাহিক ও সংযুক্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গড়ে তোলা কঠিন হবে। বিশেষ করে রামাল্লাহ, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথেলহেমকে যুক্ত করে পশ্চিম তীরের কেন্দ্রে একটি সংযুক্ত ফিলিস্তিনি শহরাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
Publisher & Editor