ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই জেতা যায় না; মাঝেমধ্যে সামরিক শক্তির অতি-আত্মবিশ্বাস ও ভুল হিসাব-নিকাশের কারণেই সবচেয়ে বড় পরাজয়গুলো ঘটে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস এমন দৃষ্টান্তে ভরপুর, যেখানে বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণের বদলে অস্ত্রের অহংকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর এর পরিণতি হিসেবে ওয়াশিংটন দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও নিষ্ফল যুদ্ধের ফাঁদে আটকা পড়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চল্লিশ দিনের যুদ্ধ’-কেও এই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষে ভারসাম্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে এই যুদ্ধ শুরু হলেও, বাস্তবে তা ‘হার্ড পাওয়ার’ বা সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রমাণের একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স তাদের এক গভীর বিশ্লেষণে লিখেছে, অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’-এর প্রাক্কালে পেন্টাগন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারবে। তাদের ধারণা ছিল— তীব্র আক্রমণ, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং আভিযানিক সক্ষমতার জোরে ইরান অল্প সময়ের মধ্যেই পিছু হটতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে মাঠে ঘটেছে ঠিক উলটোটা। ওয়াশিংটন তাদের কৌশলগত লক্ষ্য তো অর্জন করতেই পারেনি, উলটো ইরানও তার অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর ভাষায়, এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের তৈরি করা এক ঘৃণ্য পরিস্থিতির শিকার; এমন এক পরিস্থিতি, যা ওয়াশিংটনের জন্য কোনো টেকসই অর্জন তো আনতেই পারেনি, বরং তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে বিশাল নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যের বোঝা।
ক্ষমতার ভ্রান্ত ধারণা ও অতীতের পুনরাবৃত্তি
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ক্ষমতার ধারণার প্রতি এই মূল্যায়ন অত্যন্ত সমালোচনামূলক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটনে বারবার এ ধারণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছাকে চাইলেই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। একই মানসিকতার কারণে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রকে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল। উভয় যুদ্ধই নিরঙ্কুশ সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে তাদের শূন্য হাতে ফিরতে হয়।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই ভুল হিসাব-নিকাশের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিনির্ধারক মহল বিশ্বাস করত যে, সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানের প্রতিরোধ কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব এবং তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি মানতে বাধ্য হবে। তবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, প্রতিরোধ সক্ষমতা কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমানের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সামরিক সক্ষমতা, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ ঐক্য, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মূল্য চোকাতে প্রস্তুত থাকার এক সম্মিলিত রূপ। এই উপাদানগুলোকে উপেক্ষা করার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক হিসাব-নিকাশ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
ভবিষ্যতের পথ: শিক্ষা নাকি সংঘাত?
বর্তমানে পরিস্থিতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। ইরানের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকার পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার মতো ভীতি প্রদর্শনের ভাষা ব্যবহার করছেন। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, ওয়াশিংটন আবারও এমন এক চৌরাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের দুটি ভিন্ন পথের যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। হয় তাদের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মেনে নিতে হবে যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; নতুবা আবারও সেই একই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভুলের পথে হাঁটতে হবে। যেই পথ অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থই হয়নি, বরং দেশটির ওপর বিপুল ব্যয়ের বোঝাও চাপিয়েছে।
একই ব্যর্থ অনুমানের পুনরাবৃত্তি সীমিত সামরিক সংঘাতের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) অঞ্চল আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে সংঘাত, বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা যেকোনো উত্তেজনা বৃদ্ধিকেই আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন সামরিক সিদ্ধান্ত এমন এক ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ার (চেইন রিঅ্যাকশন) জন্ম দিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা খোদ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও সহজ হবে না।
প্রতিরোধের নতুন সমীকরণ ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, এই অঞ্চলে প্রতিরোধের ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কেবল আকাশপথে শ্রেষ্ঠত্ব বা নিখুঁত হামলার ওপর নির্ভর করে এখন আর প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মতো করে পালটা জবাব দেওয়ার নানা উপায় তৈরি করেছে, যা সামরিক শক্তি ব্যবহারের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণেই অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন, হুমকি-ভিত্তিক নীতি ইরানের আচরণ পরিবর্তনের পরিবর্তে বরং তাদের প্রতিরোধের যুক্তিকেই আরও শক্তিশালী করবে এবং অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব। বৃহৎ পরাশক্তিগুলোকে কেবল তাদের সামরিক ক্ষমতা দিয়ে মাপা হয় না; তাদের গ্রহণযোগ্যতা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ফাঁদ এড়িয়ে চলার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে। ওয়াশিংটন যদি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা বিশ্বের কাছে এই বার্তাই দেবে যে, তারা এখনো তাদের সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এমন ধারণা আমেরিকার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের আমেরিকার ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করতে পারে।
সতর্কঘণ্টা ও চূড়ান্ত পরিণতি
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর সতর্কবার্তাকে কেবল একটি গণমাধ্যমীয় সমালোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই বিশ্লেষণটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর জন্য এক সতর্কঘণ্টা; এটি এই বার্তাই দেয় যে, মূল সমস্যা সামরিক শক্তির অভাব নয়, বরং বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করতে ভুল করা এবং সামরিক শক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। ‘চল্লিশ দিনের যুদ্ধ’-এর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বের বৃহত্তম সেনাবাহিনীও কেবল শক্তি প্রদর্শন করে কোনো অঞ্চলের জটিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ নিজেদের পক্ষে বদলে দিতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্র এখন আবারও এক ভাগ্য নির্ধারণী পছন্দের মুখোমুখি। তাদের নীতিনির্ধারকেরা কি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবেন, নাকি সামরিক বিজয়ের পুরোনো প্রলোভন আবারও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং এমনকি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, একই কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি কখনোই ভিন্ন কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না। আমেরিকা যদি এখনো বিশ্বাস করে যে কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তন করা সম্ভব, তবে সম্ভবত তারা আবারও সেই কানাগলিতেই প্রবেশ করবে, যাকে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ‘নিজেদের তৈরি করা এক ঘৃণ্য পরিস্থিতি’ বলে আখ্যায়িত করেছে। এটি এমন এক ফাঁদ, যেখানে ঢোকার চেয়ে বের হওয়া অনেক বেশি কঠিন।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি
Publisher & Editor