‘যদি কোনো কিছুকে তুমি পুরোটা হৃদয় দিয়ে চাইতে পারো, তাহলে পুরো মহাবিশ্ব তোমাকে সেটা পাইয়ে দিতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়’ — পাউলো কোয়েলহোর আলকেমিস্টের এই উক্তি জগদ্বিখ্যাত বললেও কম হয়।
তবে ব্রাজিলিয়ান এই কথাসাহিত্যিকের এই উক্তিটাকে আজ চাইলে ইরান প্রশ্নবিদ্ধ করলেও পারে। তারাও তো চেয়েছিল নকআউটের চৌকাঠ ছুঁতে, মনপ্রাণ দিয়েই চেয়েছিল; তাহলে কেন তাদের ক্ষেত্রে হলো তার ঠিক ১৮০ ডিগ্রি উল্টো বিষয়টা! গোটা মহাবিশ্ব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো বটে, কিন্তু এই ষড়যন্ত্র গেল তাদের বিপক্ষে।
ইরান চাইলে প্রশ্ন করতেই পারে, ‘এভাবেও স্বপ্ন ভেঙে যায়?’ একবার হলে হতো, দুবারও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে তিন বার? ইরানের সামনে হিসেবটা ছিল পরিষ্কার। শেষ ম্যাচে মিশরকে হারাতে পারলেই শেষ ৩২-এ পৌঁছে যেত পশ্চিম এশিয়ার এই দেশ। গড়া হয়ে যেত ইতিহাসও, কখনোই যে নকআউটে খেলা হয়নি তাদের!
সোজা খালিলজাদেহর পায়ে ভর করে সে স্বপ্ন দেখতে শুরুও করেছিল তারা। যোগ করা সময়ে মিশরের জালে বল জড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে বাঁধ সাধল ভিএআর, আর এমন এক নিয়ম, যার দেখা মেলে কালেভদ্রে। সাধারণত মনে করা হয় পাস রিসিভ করার সময় একজন ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিতে পারলেই বুঝি অফসাইডকে ফাঁকি দেওয়া যায়। সে ধারণা যে ভুল, আসল নিয়মে যে অন্য কিছু বলা আছে, সেটা জানানোর জন্যই যেন এমন দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
খালিলজাদেহ যখন বলটা পায়ে পেলেন, তখন তার সামনে গোলমুখে দাঁড়িয়ে মিশরের এক ডিফেন্ডার, তার অনেক পেছনে মিশরের গোলরক্ষক, আর ভগ্নাংশের ব্যবধানে পেছনে ফরোয়ার্ড হামজা আবদেলকারিম। সামনে এক ডিফেন্ডার দাঁড়িয়ে, তাহলে তো অফসাইডের কোনো ঝামেলা নেই, তাহলে আর কী, তার শট যখন আছড়ে পড়ল জালে, তখন উদযাপন শুরু হয়ে গেছে সিয়াটল থেকে তেহরান পর্যন্ত। হবেই তো, প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট নিশ্চিত বলে কথা।
ঠিক তখন বাঁধ সাধল ভিএআর। অফসাইড! কারণ? অফসাইডের নিয়ম হচ্ছে, সামনে দুইজন ডিফেন্ডার থাকতে হয়, গোলকিপার সবসময় সামনে থাকেন বলেই সে সংখ্যাটা প্রায় সময় নেমে আসে ১-এ। ভুলটা সেখানেই হয়। ইরানও কি সে ফাঁদেই পা দিয়েছিল? সে যাই হোক, ভুলটা হয়েছে জায়গামতোই। যার ফল, ভাগ্যটা গেল ঝুলে। অনেকগুলো সুযোগ ছিল তাদের সামনে, তার কোনো একটার ফল পক্ষে এলেই কেল্লাফতে!
তাই তাদের অপেক্ষা ছিল আজ সকালের। ক্রোয়েশিয়াকে হারতে হতো, ক্রোয়েশিয়া জিতল; জেতারই কথা ছিল অবশ্য। এরপর উজবেকিস্তান যখন ডিআর কঙ্গোকে চমকে দিয়ে প্রথম গোলটা করে বসল, তখন আশায় বুক বেধে বসেছিল ইরান। এরপর তিনটি গোল করে কঙ্গো চলে গেল শেষ ৩২-এ, ইরানের অপেক্ষাটা গিয়ে ঠেকল অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচে, এই ম্যাচে কোনো এক দল হেরে গেলেই ৩ পয়েন্ট নিয়ে অষ্টম দল হিসেবে নকআউটে চলে যেত ইরান।
তাদেরকে প্রথমে আশা দিলেন অস্ট্রিয়ার মার্কো আর্নাতোভিচ, তার গোলে অস্ট্রিয়ানরা এগিয়ে গিয়েছিল। এরপর আলজেরিয়াকে সমতায় ফেরালেন রাফিক বেলঘালি। ৫৫ মিনিটে মার্সেল সাবিতজার গোল করলেন, ইরান একটু আশা দেখল, সেটাও উবে গেল ৫ মিনিট পর রিয়াদ মাহরেজ গোল করলে।
ডেডলকটা গিয়ে ভাঙল যোগ করা সময়েরও চতুর্থ মিনিটে। রিয়াদ মাহরেজ আবারও গোল করে এগিয়ে দিলেন আলজেরিয়াকে। যেখানে চতুর্থ অফিসিয়াল অতিরিক্ত সময় দিয়েছেনই মোটে ৫ মিনিট, সেখানে ৯৪ মিনিটের গোলের জবাব আসে কী করে! ইরান শিবির থেকে শুরু করে তেহরানে বোধ হয় উৎসবটা শুরু হয়েই গিয়েছিল চূড়ান্তভাবে।
সেটাতেও বাধ সাধল ভাগ্য। ৯৬ মিনিটে সাশা কালাইজিচের গোলে সমতা ফেরাল অস্ট্রিয়া। আলজেরিয়ারও ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি, দুই দলই চলে গেছে শেষ ৩২-এ। মাঝে কপাল পুড়ল ইরানের, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নকআউট ধরা দিতে দিতেও শেষমেশ গিয়ে ধরা দিল না।
তবে ইরান চাইলে চোয়াল শক্ত করে নিজেদের অর্জনের দিকে তাকাতেই পারে। তিন ম্যাচ খেলেছে দলটি; নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম, আর মিশরের মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচ হারেনি একটিও। এই ড্রকে আপনি জয়ের সমান করেই দেখবেন, যখন আপনার মনে পড়বে প্রেক্ষাপটটা।
যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের যুদ্ধের জেরে ইরান ফুটবল দলও বেশ ঝক্কিতে পড়েছে। একগাদা অফিসিয়ালকে ভিসা দেওয়া হয়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা মিললেও থাকার অনুমতি পায়নি পুরো দল। তিনটি ম্যাচেই ইরান খেলেছে ভিন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে। ম্যাচের আগের দিন প্রত্যেক দলের জন্য স্টেডিয়ামে যাওয়ার অনুমতি থাকে। ইরান সেটাও পায়নি, পাবে কী করে, ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ারই তো অনুমতি পায়নি তারা! দিনে দিনে গিয়ে খেলে দিনে দিনে ফিরতে হয়েছে মেক্সিকোতে। ম্যাচ শেষে রিকভারি খেলোয়াড়দের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা ইরানকে সারতে হয়েছে আরও এক বিমানযাত্রার ধকল সামলে এর পর!
একে তো ‘শত্রু’র দেশে খেলার মানসিক চাপ, তার ওপর এমন বিমানযাত্রার শারীরিক চাপ… সব মিলিয়ে এতো প্রতিকূলতা ছিল সামনে। তা সামলে ইরান পারফর্ম করেছে। চলে গিয়েছিল নকআউটের হাতছোঁয়া দূরত্বেও। একে কি আপনি অর্জন বলবেন না?
ইরানের এই যাত্রা তাই ব্যর্থ নয় কোনোভাবেই। কারণ তারা যে দেশে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে অপরাজিত থেকে, সবচেয়ে বড় কথা, মাথা উঁচু করে!
Publisher & Editor