রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

ছায়া থেকে আলোয় জিওভানি লো সেলসোর অসমাপ্ত মহাকাব্য

প্রকাশিত: ০২:৫৮, ২৮ জুন ২০২৬ |

ম্যাচের শ্বাস-প্রশ্বাসে, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে, ম্যাচের ভাগ্য বদলে জিওভানি লো সেলসোর নাম লেখা হয়ে গেছে। জিওভানি লো সেলসো কখনও নায়ক, কখনও দলের কাণ্ডারী। ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল, আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের ছোট্ট শহর রোসারিওতে জন্ম তার। এই শহর আর্জেন্টাইন ফুটবলের এক অনন্ত বিদ্যালয়। এখানকার রাস্তায় ফুটবল খেলা মানে শুধু খেলা। সেই শহরের রাস্তাতেই বড় হয়েছেন লো সেলসো। গোল করার চেয়ে গোল তৈরি করতে বেশি ভালোবাসেন। নিজে আলো নয়, আলো পৌঁছে দেওয়ার মানুষ। তার পেশাদার যাত্রা শুরু হয় রোসারিও সেন্ট্রালে।

ফরাসি জায়ান্ট প্যারিস সেইন্ট জার্মেইঁ তাকে নিয়ে যায়। লো সেলসো সহজ পথ পাননি। সুযোগ এসেছে, গেছে। শুধু প্রতিভা নয়, অপেক্ষাও ফুটবল জীবনের অংশ। তারপর আসে এক নতুন অধ্যায়। স্পেনের রিয়াল বেতিস। ফুটবল তাকে বলেছে, এবার নিজের ভাষায় কথা বলো। বেতিসে গিয়ে লো সেলসো বদলে গেলেন। মাঝমাঠে তার দৃষ্টি, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণভাগ ভেঙে দেওয়া পাস—তিনি হয়ে উঠলেন দলের হৃদস্পন্দন।

নতুন গন্তব্য টটেনহ্যাম হটস্পার। সেখানে লো সেলসোর পথ কখনও মসৃণ হয়নি। চোট এসেছে, ছন্দ হারিয়েছেন, আবার ফিরেছেন। নতুন করে শুরু হলো। আবার ফিরে গেলেন রিয়াল বেতিসে। যেন পুরোনো শহরে ফিরে পাওয়া নিজের ঠিকানা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার যাত্রাটাও কম নাটকীয় নয়। লো সেলসো থাকলে আর্জেন্টিনা অন্যভাবে শ্বাস নেয়। তিনি সময়ের খেলোয়াড়। এক সেকেন্ড বেশি অপেক্ষা করেন, তারপর এমন একটি পাস দেন, যা প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেঙে দেয়। তার বাঁ পায়ের স্পর্শে বল যেন কখনও তাড়াহুড়ো করে না। ফুটবলের পৃথিবী গোলদাতাদের মনে রাখে। যারা গোলের জন্ম দেয়, তাদের কথা কম বলা হয়। লো সেলসো সেই নীরব স্রষ্টাদের একজন।

চলতি বিশ্বকাপ তার ক্যারিয়ারে নতুন এক আবেগের অধ্যায় হয়ে এসেছে। গত বিশ্বকাপ চোটের কারণে শেষ মুহূর্তে মিস করার যন্ত্রণা নিয়ে এবার ফিরেছেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে। আর্জেন্টিনা দলে জায়গা পাওয়ার পর অপেক্ষা ছিল মাঠে নিজের ছাপ রাখার। ম্যাচের ১৯ মিনিটে সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন তিনি। সেটিই ছিল চলতি বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনার অন্য কোনো ফুটবলারের প্রথম গোল।  

শুধু গোল নয়, পুরো ম্যাচজুড়ে মাঝমাঠে তার নিয়ন্ত্রণ, বল বণ্টন আর আক্রমণের ছন্দ তৈরিতে অসাধারন লো। আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়ে পরের পর্বে উঠেছে। সেই যাত্রায় লো সেলসোর নাম নতুন করে উচ্চারিত হতে শুরু করেছে।  

জিওভানি লো সেলসো গল্প লিখে গেছেন। তার ফুটবল জীবন আসলে এক ধৈর্যের পরীক্ষা। রোসারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি যখন বল পায়ে প্রথম দৌড়ানো শুরু করে, তখন কেউ জানত না সামনে অপেক্ষা করছে মহাদেশ পেরোনো এক যাত্রা। আর্জেন্টিনার ফুটবলে বেড়ে ওঠা মানেই প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করা। প্রতিভা অনেক, সুযোগ সীমিত। লো সেলসো খুব ছোট বয়স থেকেই আলাদা ছিলেন। জায়গা বোঝার ক্ষমতা, বল ছাড়ার সঠিক সময় নির্বাচন আর অন্যদের খেলার মান বাড়িয়ে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। তার বাঁ পায়ের পাসে কখনও তাড়াহুড়ো নেই, তার খেলায় কখনও অহংকার নেই, তার ফুটবলে আছে চিন্তা। ফুটবল ইতিহাস হয়তো সবসময় তাকে প্রথম সারির পোস্টারে রাখবে না। অনেক বড় জয়ের পেছনে একজন নীরব কারিগর থাকেন। জিওভানি লো সেলসো সেই কারিগরদের একজন। মাঠে নিজে কথা বলেন না, বলকে কথা বলতে দেন। সেই বলই জিওভানি লো সেলসোর পক্ষ নিয়ে সাক্ষ্য দেয়—সব নায়ক গোল করে না, কেউ কেউ গোলের গল্প লিখে দেয়।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor