নারী যেসব ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সার্ভাইক্যাল বা জরায়ুমুখের ক্যানসার। বিশ্বে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ভারত। নেপথ্যে একদিকে যেমন রয়েছে ক্যানসার নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব, ঠিক তেমনই যৌন রোগ নিয়ে ছুঁৎমার্গ।
আজও নানা সমস্যা হলে ডাক্তারের কাছে যেতে চান না অনেক নারীই। তাই বাড়বাড়ন্ত অন্যান্য রোগের সঙ্গে জরায়ুর মুখের ক্যানসারেরও। এ রোগের নেপথ্যে রয়েছে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি)সংক্রমণ, যা মূলত ছড়ায় যৌন সংক্রমণের মাধ্যমে। কখনো কখনো বডি ফ্লুয়িডের (চুমু বা ওরাল সেক্স) মাধ্যমেও ছড়াতে পারে সেই ক্যানসার।
প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট বা এইচপিভি টেস্ট করলে খুব সহজেই ধরা পড়ে— এই ক্যানসারের ভাইরাস কারও শরীরে রয়েছে কিনা। এ বিষয়ে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. সুবীর গাঙ্গুলি বলেছেন, এ ক্ষেত্রে পশ্চিমের দেশে এইচপিভি টেস্ট বেশি ব্যবহৃত হয়। ভারতে সার্ভাইক্যাল ক্যানসার শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট বেশি হয়। প্যাপ স্মিয়ারের খরচও অনেকটাই কম, মাত্র ২০০ টাকার মতো খরচ করলেই এ টেস্ট করানো সম্ভব।
সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের মোট চারটা স্টেজ থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে একটা সুবিধা রয়েছে। এই রোগকে প্রি-ক্যানসার স্টেজেই খুব সহজে শনাক্ত করা যায়। প্রয়োজন শুধু একটু সচেতনতার।
সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের স্টেজ শূন্য
আপনি মনে করেন, এ সময়ে এইচপিভি ভাইরাস আপনার শরীরে রয়েছে। রোগী ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন, কিন্তু তার কোনো রকম লক্ষণ থাকে না। রোগ ধরা পড়ে না। অর্থাৎ প্রি-ক্যানসার স্টেজ বলা যেতে পারে।
স্টেজ ১
এ পর্যায়ে ক্যানসার শুধু জরায়ুর মুখের অংশেই সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ রোগটি এখনো শরীরের অন্য কোনো অংশে ছড়ায়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
স্টেজ ২
এ পর্যায়ে ক্যানসার জরায়ুমুখের বাইরে ছড়াতে শুরু করে। জরায়ুর মুখের চারপাশেও ছড়িয়ে যায় ক্যানসার সেল। তবে এখনো তা পেলভিক ওয়াল বা যোনির নিম্নাংশে পৌঁছায় না। এ সময় রোগীর অস্বাভাবিক রক্তপাত হতে পারে, পেলভিকে ব্যথা কিংবা যৌন মিলনের সময় প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বালা ভাব বা রক্তপাত হতে পারে। সহবাস বেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
স্টেজ ৩
এ স্টেজে ক্যানসার সার্ভিক্স বা জরায়ুর মুখ ছাড়াও অন্যান্য আরও নানা অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যানসার সেল যদি যোনির নিম্নাংশ বা পেলভিক ওয়ালে পৌঁছে যায়, তখন তাকে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের স্টেজ ৩ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ পর্যায় থেকেই ক্যানসারকে অ্যাডভান্সড স্টেজ বলেও ধরে নেওয়া হয়। এ সময় যোনিতে অস্বস্তি বা যৌন মিলনে সমস্যা বেড়ে যায়। তা কিডনির কার্যকারিতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ পর্যায় থেকেই চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে বেশ জটিল হয়ে ওঠে।
স্টেজ ৪
এটি সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের সবচেয়ে অগ্রসর পর্যায়। এ সময় ক্যানসার মূত্রথলি, মলাশয় বা শরীরের অন্যান্য় অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে— ফুসফুস, লিভারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পৌঁছে যায় এ মারণ রোগ। চতুর্থ স্টেজে পৌঁছে গেলে রোগ নিয়ন্ত্রণ বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
ডা. সুবীর গাঙ্গুলি বলেন, স্টেজ ১-৩ অবধি সঠিক সময়ে রোগ ধরা পড়লে এবং চিকিৎসা করা গেলে রোগী সুস্থ হয়েও উঠতে পারেন। অবশ্যই তা নির্ভর করে ক্যানসার কতটা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে, তার ওপরে। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারকে ১০০ শতাংশ নির্মূল করা সম্ভব। স্টেজ ৩ হয়ে গেলে সেটাই কমে ৬০-৭০ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু স্টেজ ৪ অবধি চলে গেলে, কোনো ধরনের ক্যানসারই সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়। বিশেষ করে সার্ভিক্স থেকে ক্যানসার যকৃত বা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়লে, সেই রোগীর সেরে ওঠার সম্ভাবনা খুব কম।
যে লক্ষণ দেখলে সতর্ক হওয়া উচিত—
১. অতিরিক্ত সাদা স্রাব নিঃসরণ
২. মেনোপজের পর রক্তপাত হলে
৩. যৌন মিলনের সময় বা পরে রক্তপাত, ব্যথা, যন্ত্রণা ও অস্বস্তি হলে
৪. মাসিক ছাড়াও রক্তপাত হলে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে
ডা. সুবীর গাঙ্গুলি বলেন, এ রোগের লক্ষণ প্রথম থেকেই থাকে। তবে আমরাই সেটা উপেক্ষা করি। ক্যানসার যত ছড়াবে, সমস্যাও তত বাড়বে। যোনি স্থানে ইনফেকশন, রক্তপাত, সাদা স্রাব, ব্যথা-যন্ত্রণা, জ্বালাও বাড়তে থাকে। সহবাস ট্রমায় পরিণত হয়। এ সমস্যা বাড়তে বাড়তে যখন ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন হয়তো তা অ্যাডভান্সড স্টেজে পৌঁছে গেছে।
আমাদের সমস্যা হলো— ভারতে শতকরা ৭০-৮০ শতাংশ ক্যানসারই অ্যাডভান্সড স্টেজে ধরা পড়ে, যখন আর বিশেষ কিছু করার থাকে না।
তিনি বলেন, দুটি কারণে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের রোগী মারা যান। একটি হলো— অতিরিক্ত ব্লিডিং। যার ফলে সিভিয়ার অ্যানিমিয়া হয়ে মৃত্যু হয় রোগীর। অন্যটি হলো— রেনাল ফেইলিওর। মূত্রনালি ব্লক হয়ে গিয়ে কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কিডনি ফেইলিওর হয়ে নেমে আসে মৃত্যু।
ডা. সুবীর গাঙ্গুলি বলেন, সাধারণত সার্ভাইক্যাল ক্যানসার ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব কম। রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেও আমরা তাদের নিয়মিত ফলোআপের মধ্যেই রাখি। যদি কেউ ডাক্তারের কথা না শোনেন বা ফলোআপ ট্রিটমেন্ট না করান, একমাত্র সে ক্ষেত্রেই এই রোগ ফিরে আসতে পারে। তা ছাড়া সব বিবাহিত নারীকে আমরা একটা প্যাপ টেস্ট করে নেওয়ার পরামর্শ দিই। এতে আগে থেকেই অনেক বেশি নিরাপদ থাকা যায়।
Publisher & Editor