বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

মানসিক চাপ যেভাবে ব্রণ বা চর্মরোগের সমস্যা বাড়াতে পারে

প্রকাশিত: ০৬:৫০, ০২ জুন ২০২৬ | ১৭

ব্রেকআপের পর ভগ্ন হৃদয়ের পাশাপাশি একজিমার তীব্র সমস্যা, কিংবা বাসা বদলানোর ঝক্কি সামলাতে গিয়ে হঠাৎ পুরো মুখ ব্রণে ভরে যাওয়া—আমাদের জীবনে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। অনেকেই বিষয়টিকে কাকতালীয় মনে করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে মন ও ত্বকের গভীর সংযোগ।

দীর্ঘদিন ধরেই মনে করা হতো মানসিক চাপের একটি বড় প্রভাব পড়ে ত্বকের ওপর। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোর গবেষণা বলছে, চর্মরোগের চিকিৎসা এবং সার্বিকভাবে ত্বকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মস্তিষ্ক ও ত্বকের এই মেলবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লন্ডনের সাইকোডার্মাটোলজি (মনো-চর্মরোগ বিজ্ঞান) বিশেষজ্ঞ ডা. আলিয়া আহমেদ বলেন, শারীরিক এবং মানসিক—দুই ধরনের চাপই আপনার ত্বকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা অনেক সময় নিজেদের গোয়েন্দার মতো মনে করেন, যারা রোগীর শারীরিক লক্ষণের পাশাপাশি তার মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার খোঁজ নেন।

মস্তিষ্ক ও ত্বকের সেই ‘দুষ্টচক্র’

চিকিৎসকদের মতে, মানবদেহের বিকাশকালীন একই কোষগুচ্ছ থেকে আমাদের মস্তিষ্ক এবং ত্বকের সৃষ্টি হয়। ফলে এদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। যখন আমরা মানসিক চাপে থাকি, তখন মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ‘হাইপোথ্যালামাস’-এ সংকেত পাঠায়। এর ফলে শরীর থেকে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন নিঃসৃত হয়ে রক্তে মিশে যায়।

এই হরমোনগুলো শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন বাড়িয়ে দেয়, যা ত্বকের সুরক্ষাকবচকে দুর্বল করে ফেলে। ত্বক তখন আর্দ্রতা হারায় এবং বাইরের ধুলোবালি, পরাগরেণু বা অ্যালার্জেন সহজেই ত্বকে প্রবেশ করে একে শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তোলে।

হরমোনের কারসাজি

মানসিক চাপের সময় নিঃসৃত রাসায়নিক উপাদান ত্বকের সেবাসিয়াস গ্ল্যান্ড বা তৈলগ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে অতিরিক্ত ‘সিবাম’ (তেল) তৈরি করে। এই অতিরিক্ত সিবাম লোমকূপ বন্ধ করে ব্রণের জন্ম দেয়।

একই সঙ্গে মানসিক চাপ শরীরে জীবাণু ধ্বংসকারী ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড’-এর মাত্রা কমিয়ে দেয়।

ফলে ত্বক সহজেই ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং জ্বরঠোসা কিংবা দাদের মতো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
চিকিৎসকেরা একে একটি দুষ্টচক্র বা  ইচ-স্ক্র্যাচ সাইকেল বলে অভিহিত করেন। মানসিক চাপের কারণে ত্বকে চুলকানি তৈরি হয়, আর চুলকালে ত্বকের ক্ষতি হয়ে চুলকানি আরও বাড়ে। এই বিরক্তিকর অনুভূতি রোগীর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়, যা প্রকারান্তরে ত্বকের অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তোলে।

মুক্তির উপায় কী?

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ ও স্নায়ুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রজিতা সিনহা জানান, মানসিক চাপ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন মাথাব্যথা, অনিদ্রা বা খিটখিটে মেজাজের মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে তিনি নিয়মিত ব্যায়াম ও মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন বা সচেতন ধ্যান করার পরামর্শ দেন।

নিয়মিত ব্যায়াম : গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম কর্টিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।

মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন : এই চর্চা মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা ও পুরুত্ব বাড়ায়, যা মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করে। সোরিয়াসিস রোগীদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, মূল চিকিৎসার পাশাপাশি যারা মেডিটেশন করেছেন, তারা দ্রুত সুস্থ হয়েছেন।

সঠিক বিশ্রাম : অনেকে জিমে গিয়ে বা হাঁটার সময়ও ঘরের বা কর্মক্ষেত্রের দুশ্চিন্তা করেন। চিকিৎসকদের মতে, হাঁটা বা ব্যায়ামের সময় মনকেও পুরোপুরি বিশ্রাম দিতে হবে, যাকে বলা হয় 'ওয়াকিং মেডিটেশন'।

ডা. আলিয়া আহমেদ মনে করেন, শুধু মানসিক চাপ কমালেই চলবে না, পাশাপাশি ত্বকের বাহ্যিক যত্নও সমান জরুরি। সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং একটি নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাত্রার মাধ্যমেই কেবল এই সমস্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব। মন ভালো থাকলে, তার উজ্জ্বলতা ত্বকেও প্রতিফলিত হবে—এটাই সাইকোডার্মাটোলজির মূল কথা।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor