চোখ লাল হয়ে আছে। কটকট করে। ধনু মিয়া, তার ভাইয়ু আর কুটি ভাইয়ের ‘জয় বাংলা’ হয়েছে। জয় বাংলা আবার হয় কী করে, ধনু মিয়া চিন্তা করে পায় না।
তারা তো ‘জয় বাংলা মিছিল খেলা’ খেলে। ধনু মিয়া, তার ভাইয়ু আর সিংলাছড়ার কিছু পোলাপান। ‘জয় বাংলা মিছিল খেলা’ মানে তারা একত্র হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে, মিছিল করে আর স্লোগান দেয় ‘জয় বাংলা’! সেই ‘জয় বাংলা’ তাদের হয়ে যাবে, ধনু মিয়া মোটে ভাবেনি।
জয় বাংলার লোক ধনু মিয়ারা।
দোলনের জবা পিসি একদিন ঋভু রিংকুর বীথি কাকিকে বলছিল, এও আরেক ধাঁধা কি না। জয় বাংলা তবে কী আসলে?
ধনু মিয়ার বয়স চার বছর। তার ভাইয়ুর বয়স তিন বছর। কুটি ভাই যুদ্ধ লাগার কিছুদিন আগে হয়েছে।
এখনো কথা বলতে শেখেনি। ট্যাঁ ট্যাঁ করে। ধনু মিয়াদের দেশে যুদ্ধ লাগার পর তারা পালিয়ে ‘বর্ডার’ হয়ে এই সিংলাছড়া চা-বাগানে এসেছে, ধনু মিয়া ‘বর্ডার’ শব্দটাও বোঝেনি। তাদের কাকা চা-বাগানের কেরানি। তারা কাকার ‘কোয়ার্টারে’ উঠেছে।
তাদের বাবা তাদের সঙ্গে আসেননি। শরণার্থী ক্যাম্পে আছেন। মানুষের সেবা করছেন। সেই ক্যাম্প কোথায়? কত দূর? ধনু মিয়ারা বাবাকে দেখে না বহুদিন।
ধনু মিয়াদের মা লীলা। লীলার দুই ভাই, ধনু মিয়াদের দুই মামা, বড় মামা ও মোহন মামা যুদ্ধ করতে গেছেন। এ জন্য লীলা অনেক কান্নাকাটি করেন। দুই ভাইয়ের জন্য ব্রত আচার করেন, উপবাস থাকেন। গণক ডেকে গণনা করিয়ে দেখেছেন। গণক বলেছেন, লীলার দুই ভাই শিমুল ও মোহন বেঁচে আছেন, যুদ্ধ শেষ হলে তাঁরা ফিরবেন। ধনু মিয়াদের বড় মামার নাম শিমুল। মোহন মামা বলেন, ধনু মিয়ার নাক একদম তাঁর নাকের মতো হয়েছে। টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো নাক। মোহন মামা এতে এত খুশি কেন ধনু মিয়া চিন্তা করে পায় না। দুনিয়াদারির অনেক কিছুই আসলে ধনু মিয়া চিন্তা করে পায় না। যেমন—এই চা-বাগানের নাম সিংলাছড়া, রাতাবাড়ী কী তবে? ধনু মিয়াদের কাকার অ্যাসিস্ট্যান্ট রামা। রাতাবাড়ী বাজারে যান। সদাইপাতি কিনে নিয়ে আসেন। রামা মস্ত লম্বা কুচকুচে কালো বরন মানুষ। মাঝেমধ্যে ধনু মিয়াকে পিঠে ঝুলিয়ে রাতাবাড়ী বাজারে নিয়ে যান।
ধনু মিয়ার নাম আসলে ধনু মিয়া না। আসল ধনু মিয়া চানাচুরওয়ালা। ছোটখাটো মানুষ। অ্যায়সা গোঁফওয়ালা, পাগড়ি পরে। রাতাবাড়ী বাজারে মানুষটা ঘটিগরম চানাচুর বানায় আর অদ্ভুত এক সুর করে বলে যেতে থাকে,
আইয়োওবা ময়না হকল
দিলাইতাম আর খাইলিতায়
আইয়োওবা ময়না হকল
দিলাইতাম আর খাইলিতায়
(এসে পড়ো পোলাপান
দেব আর খেয়ে নেবে)
ভাইয়ু আর কুটি ভাইয়ের বড় ভাই ব্যাপারটা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছে যে মনে মনে নিজের নাম ধনু মিয়া গ্রহণ করেছে। ভাইয়ুকে শুধু বলেছে, ‘আমার নাম ধনু মিয়া।’
কত দিন হলো সিংলাছড়া চা-বাগানে আছে ধনু মিয়ারা? বহুদিন বহুদিন। সিংলাছড়া চা-বাগানে আখক্ষেত আছে, প্রচুর শিয়াল আছে আর প্রচুর কাঠবিড়ালি আছে—মানুষজন বলে ‘কটা’। রাত হলে দূর-অদূরে শিয়ালরা হুক্কা হুয়া ডেকে সারা হয়, আকাশে অনেক তারা ফুটে থাকে, অন্ধকারে অনেক জোনাকি ফুটে থাকে।
জয় বাংলা হয়ে বিরাট সর্বনাশ হয়ে গেল ধনু মিয়ার। কাল সকাল থেকে চোখ কটকট করছিল। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখের পাতা খুলতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল চোখের দুই পাতা কেউ আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছে। গরম জলের অনেক ঝাপটা দিয়েও চোখ খুলতে খুবই কষ্ট হয়েছে। এ জন্য আজ ঘুম ধরলেও ধনু মিয়া ঘুমিয়ে পড়তে চাচ্ছে না। ভাইয়ু, কুটি ভাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ধনু মিয়াদের কাকা অফিসপাট সেরে তাস খেলেন বরুণ কাকাদের বাসায়। ফিরতে রাত হয়। আজ আগে ফিরলেন। সঙ্গে বরুণ কাকা, তমাল কাকা ও বাদল কাকা। বাদল কাকা মাকে বললেন, ‘বৌদি, জয় বাংলা তো স্বাধীন হয়ে গেছে!’
কী? কী কী কী?
জয় বাংলা স্বাধীন হয়ে গেছে মানে কী? যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে? বড় মামা, মোহন মামা ফিরবেন? অত চিন্তা করতে পারল না ধনু মিয়া। ঘুম ধরে গেছে, ঘুমিয়ে পড়ল।
এদিকে ব্যবস্থা হলো রাতেই, চা-বাগানের বড় চাঘর বাবু জিপের ব্যবস্থা করে দিলেন। লীলা তাঁর তিন পুত্রকে নিয়ে রওনা হলেন স্বাধীন জয় বাংলার উদ্দেশে। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর আর চোখ খুলতে পারে না ধনু মিয়া। টেডি পিসি, ঠাম্মা, ফুল কাকু, সেজদি, দুলি, পিংকু, ছোট কাকু—কতজনের গলা যে শুনল। বুঝতেই পারল না কিছু। টেডি পিসি, পিংকু, ছোট কাকুরা কি সিংলাছড়া চা-বাগানে চলে এসেছেন নাকি? কখন এসেছেন?
‘ও মা, আমার চোখ খুলে দাও।’
লীলা সেই গরম জল করে, ঝাপটা দিয়ে চোখ মুছিয়ে, চোখ খুলে দিলেন পুত্রের। জয় বাংলা চোখে নিয়ে ধনু মিয়া জয় বাংলার প্রথম সকাল দেখল। রৌদ্রকরোজ্জ্বল।
Publisher & Editor