ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এবং নৌবাহিনীর সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মাঝখানে আটকা পড়ে গেছে। তেহরানের সঙ্গে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, বিশ্বের জ্বালানি ধমনিগুলো (জ্বালানি পথ) ততটাই সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার অর্থ কেবল অর্থনৈতিক চাপ দ্বিগুণ হওয়া নয়, বরং তা বহুগুণে বেড়ে যাওয়া।
এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন আসলে কী করছে? একদিকে প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল শুরু করতে জটিল সামরিক অভিযান সংঘটিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে হস্তক্ষেপ করে তেলের দাম কমানোর উপায় খুঁজছে। পাশাপাশি প্রচার চালাচ্ছে– জ্বালানির উচ্চমূল্য সাময়িক ঘটনা।
কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের এসব উদ্যোগ তত জটিল হচ্ছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও স্থবির। শোধনাগারে হামলার ঘটনা দেখাচ্ছে, আগামীতে মজুত করার জায়গার অভাবে বড় উৎপাদকরা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারেন।
কুয়েত, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের তেলের খনিগুলোতে উৎপাদন সীমিত করেছে। একবার খনিগুলো বন্ধ হয়ে গেলে, তা চাইলেই দ্রুত সচল করা যায় না। তাই উৎপাদন বন্ধ হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ঘাটতি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, বাজারের এই অবস্থা যদি স্থায়ী হয় বা আরও খারাপ হয়, তাহলে সামরিক অভিযানের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহী, বাজার বিশ্লেষক এবং কূটনীতিকদের মতে, এই সংকটের একমাত্র তাৎক্ষণিক সমাধান হলো মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় জাহাজ চলাচল শুরু করা। প্রশাসনের ভেতরে নৌ অভিযানের সম্ভাব্যতা নিয়ে গভীর আলোচনা চলছে। নৌবাহিনী পাঠানোর ঝুঁকির দিকটিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
‘মৃত্যু উপত্যকা’
ট্রাম্প প্রশাসনের একটি সূত্র এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ‘ডেথ ভ্যালি’ বা মৃত্যু উপত্যকা হিসেবে বর্ণনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জলসীমার কাছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন মোতায়েন করলেও যুদ্ধের ক্ষেত্রে সমুদ্রের বাস্তবতা ভিন্ন রকম থাকে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা যে কোনো সময় মাইন স্থাপনকারী ছোট জলযান, বিস্ফোরক ভর্তি নৌকা কিংবা উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েনের সক্ষমতা রাখে। প্রশাসনের সূত্রটি বলছে, ইরানকে মোকাবিলায় সেখানে যে পরিমাণ সক্ষমতা দরকার, তা জড়ো করতে সময় প্রয়োজন। ততদিনে জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছাবে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরের কাছে থাকা মার্কিন জাহাজগুলো সামরিক কার্যক্রম চালালেও প্রণালির বিপজ্জনক ‘পয়েন্ট’গুলো এড়িয়ে চলে। এ অবস্থায় সেগুলোকে বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দেওয়ার কাজে মোতায়েনের অর্থ হলো, তেলবাহী ট্যাঙ্কারের পাশাপাশি জাহাজগুলোকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরান এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছে। পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোতে তাদের হামলা করার আশঙ্কা কম। বরং জাহাজগুলো যখন তেল বা গ্যাস নিয়ে ফিরতি পথে যাত্রা করবে, তখনই সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে। ইরান এমন কৌশল বাস্তবায়ন করলে তা ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এলএনজিবাহী ট্যাঙ্কারগুলোতে বিস্ফোরণ কিংবা তেলবাহী ট্যাঙ্কারে আঘাত হানা হলে তা সামুদ্রিক পরিবেশ ও অর্থনীতি দুটির জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে।
জ্বালানিবাহী ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা দিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সম্প্রতি প্রতিরক্ষামূলক পাহারা অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন। ইরান সঙ্গে সঙ্গে সেটির প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি সোমবার এক্সে পোস্ট দিয়ে বলেছেন, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জ্বালানো যুদ্ধের আগুনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে কোনো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
বিকল্পের খোঁজ
সামরিক বাহিনী যখন ইরানি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করার পরিকল্পনা করছে, তখন প্রশাসন বাজার স্থিতিশীল করতে বিকল্প পথ খুঁজছে। তারা বাজারের অস্থিরতা সাময়িক বলে প্রচার চালাচ্ছে। শিগগিরই স্থিতিশীলতা ফেরার আশ্বাস দিচ্ছে। হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস এবং জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে জ্বালানির দাম কমানোর উপায় নিয়ে কথা বলেছেন। ফেডারেল সংস্থাগুলোকে দামের আকস্মিক বৃদ্ধি রোধে তাৎক্ষণিক সমাধান খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় গত সোমবার জি৭ ভুক্ত দেশগুলো ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ-এসপিআর’ থেকে তেল ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা করে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসও এসপিআর ব্যবহারের কথা ভাবছে না। বরং তারা জাহাজ মালিকদের পণ্য পরিবহনে উৎসাহিত করতে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি বীমা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারেরও ইঙ্গিত দিয়েছে। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলা থেকে আরও তেল উৎপাদনের বিষয়টিও চিন্তায় আছে। কিন্তু সবই আসলে সময়সাপেক্ষ উদ্যোগ। বিপরীতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস বাকি। এর আগে পেট্রোলের দাম বাড়তে থাকলে তা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই ক্ষতি কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা দিয়ে কাটানো সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত হরমুজ প্রণালি সচলের উদ্যোগ নেওয়া। সেটি যতক্ষণ না হবে, ততক্ষণ ২১ মাইল প্রশস্ত জলপথের কাছে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি হয়ে থাকতে হবে।
Publisher & Editor