সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

নারীদের পিছিয়ে থাকার একমাত্র কারণ সমাজ : মিথিলা

প্রকাশিত: ০৬:৫৭, ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১০

নারী একটা পরিবারের স্তম্ভ, অনুপ্রেরণা। তাদের প্রতি সম্মানার্থেই একটি দিনকে আলাদাভাবে স্মরণ করা হয়। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বব্যাপী এটি উদযাপিত হয়।

এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। 
বিশেষ এই দিনটিতে নারীর অবদান, মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নিয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তারকা অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলা। সেই সাক্ষাৎকারটিই পুনরায় প্রকাশ করা হলো। 

নারী দিবসের গুরুত্ব

নারী দিবস কেন পালন হয়, সেটা বোঝা খুব জরুরি।

অধিকারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে, কর্ম ক্ষেত্রে এমনকি অনেক প্রোডাক্টিভ ক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে আছে। অথচ পুরো পৃথিবীতে অনেক অনেক গবেষণা, উদাহরণ রয়েছে যেখানে এসব প্রতিবন্ধকতা থেকে যদি নারীদেরকে এগিয়ে যেতে দেওয়া হয় তাহলে শুধু অর্থনৈতিক না, সামাজিকভাবেও এসবের সুবিধা অনেক বেশি হবে। এটা যেহেতু এখনো হচ্ছে না, সেহেতু একটা দিন নারীদের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে যেন আমরা সবাই সচেতনভাবে এটা মনে করি যে, নারী ও পুরুষ-এই দুই প্রজাতি নিয়েই এই পৃথিবী। একটা প্রজাতি যদি পিছিয়ে থাকে তাহলে পৃথিবীর চাকাটা সচল হবে না।

নারীরা এগোলেও প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে

এই সময়ে না, আরও কয়েক শ বছর আগে থেকেই নারীরা নানারকম প্রতিবন্ধকতা ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়েও অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে। আমার কথা হলো—এখনো যদি নারীদের সেই একই প্রতিবন্ধকতা ঠেলতে হয় তাহলে আমরা এগিয়ে কোথায় গেলাম? হাজারো স্ট্যাটিস্টিকস, রিসার্চ ডাটা আছে যেগুলো বলে যে, নারীরা সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে। তারা এই জন্য পিছিয়ে না যে, সৃষ্টিকর্তা তাদের কম বুদ্ধিমত্তা বা মানসিক, শারীরিক ক্ষমতা কম দিয়েছে; তাদের পিছিয়ে থাকার একমাত্র কারণ সমাজ। সমাজ নারীর জন্য এমন সব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে যা নারীরা যতটুকু সম্ভাব্য অর্জন করা দরকার তারা ঠিক সেটা করতে পারছে না।

আমরা বলি যে, পৃথিবী এগিয়ে গেছে। না, সময় এগিয়ে গেছে। একদল নারী সবসময়ই ছিল যারা সব প্রতিবন্ধকতা ঠেলে এগিয়ে গেছে, যার কারণে আজকে আমরা এখানে অবস্থান করছি। এখন আমরাও যদি সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো না ভাঙতে পারি তাহলে আমার সন্তানও সে জায়গায় যেতে পারবে না। নারীদেরকে আদর্শ বা নারী-পুরুষের সমতার কথা যে বলি, সেটা হয়ত আমরা পাব না। আমার মনে হয়, এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া।

নারীর অবদান মূল্যায়ন

মূল্যায়নের বিষয় তো পরে, আগে আমাদের স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেন, স্বাধীনভাবে হাঁটতে দেন। এখন যতটুকু অর্জন করার সেটাই তো করতে পারিনি। এই যুগে ক্ষমতায়নের নামে ‘ট্রিপল বারডেন’ -কে মহিমান্বিত করা হচ্ছে। এটা তো দরকার নেই। খুব সহজভাবেই কিন্তু ঘরের কাজ, বাইরের কাজ এসব নিয়ে বোঝাপড়াতে আসা যায়। কিন্তু তা না; ঘর তুমি সামলাবে, বাইরের কাজও তুমি সামলাবে এবং সন্তানও তুমি সামলাবে- অর্থাৎ সব তুমি সামলাবে।

এই যুগে এসেও তো আমি একটু আরাম করে বাসে চড়তে পারি না, রাতের বেলা রাস্তায় হাঁটতে পারি না, ভয় লাগে আমার। যে ভয় নারীদের দুই শ বছর আগেও ছিল।

শোবিজে নারীদের বাস্তবতা

কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি, হ্যারেসম্যান্ট—এটা শুধু শোবিজ না, সব সেক্টরেই আছে। আলাদা করে শোবিজ নিয়ে বলতে চাই না। তবে হ্যাঁ, শোবিজে হয়তো একটু গ্ল্যামারের বিষয় আছে যেখানে নারীকে একটু সাজগোজ করতে হয়। সেখানেও তো নারীকে প্রতিনিয়ত জাজ করা হচ্ছে। নারীর হাত দেখা গেলে কিংবা কোমর দেখা গেলে—গেল গেল সব গেল, সামাজিক অবক্ষয় হয়ে গেল—বলে মন্তব্য শুরু হয়। এই সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষদের প্রতি সহজেই আঙুল তুলে কথা বলা হয়। এরা ভালো মেয়ে না, মিডিয়াতে কাজ করে-এরকম একটা টোনে কথা বলে উঠে। সহজেই জাজ করে ফেলে।

যদি প্রশ্ন এটা হয়, আমাদের শোবিজে মেয়েদেরকে কমপ্রোমাইজ করতে হয় কিনা—তাহলে আমি বলব, শুধু বাংলাদেশে না, যেখানে পরিবেশ খারাপ সেখানে সব জায়গাতে, সেক্টরে এই হ্যারেসম্যান্ট হয়।

বন্ধুত্বে নারী-পুরুষ বিভাজন নয়

বন্ধুত্বের জায়গায় নারী-পুরুষ কথাটাই আসা উচিত না। আমি বলব, একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের বন্ধুত্ব। যেখানে ভয় থাকবে সেখানে কোনদিনও বন্ধুত্ব হবে না। আমার প্রচুর ছেলে বন্ধু আছে কিন্তু আমি সেখানে কখনো অস্বস্তিতে পড়িনি। কিন্তু এমন অনেকেই আছে যাদের আশেপাশে মেয়েরা একটু অস্বস্তিতে পড়ে। তাদের সাথে বন্ধুত্ব হওয়াটা কঠিন।

ব্যক্তিগত জীবনের চ্যালেঞ্জ

মেয়েদের প্রতিবন্ধকতাটা আসলে খুব ছোটবেলা থেকেই শুরু হয় এবং মেয়েরা জানে সেটা কীভাবে শুরু হয়। একদম শিশুকাল থেকে শুরু হয়ে স্কুল-কলেজে এরপর কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। একজন পাবলিক ফিগার হিসেবে আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেকের অনেক বেশি আগ্রহ, মাথা ব্যাথা এবং সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে আমাকে জাজ করে ফেলে। মাঝে মাঝে আমি কর্মক্ষেত্রে যা অর্জন করেছি এই বিষয়টা সেটাকে পেছনে ফেলে দেয়। এটা আমার জন্য অনেক বড় এক প্রতিবন্ধকতা। আমার ধারণা, আমি মেয়ে বলে এটা বেশি হয়। কারণ, নারীদেরকে তো সমাজ একটা ফরমেটের মধ্যে বেঁধে রেখেছে যে, এটা মানে ভালো, এটা মানে খারাপ। জোরে কথা বললে খারাপ, স্বাধীনভাবে চলতে চাওয়া মানেই সে উদ্ধত নারী।

আর এখন তো সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে অনেক সাধারণ মানুষ পাবলিক ফিগারদের কাছে চলে আসতে পারে, নানা রকম কটু মন্তব্য করতে পারে; যেটা এখন অহরহ হচ্ছে। এগুলোকে ইগনোর করে সামনে এগিয়ে যাওয়াটাও একটা চ্যালেঞ্জ। আমার জীবনে এবং কর্মক্ষেত্রে যদি আমি সৎ থাকি তাহলে কারো কথাতেই কিছু আসবে যাবে না। এখানে সৎ বলতে নৈতিকতা-অনৈতিকতা দুটোই বলছি, আমি তো কাউকে বিরক্ত করছি না, কারো ক্ষতি করছি না, এমন কোন অন্যায় করছি না যেটাতে অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমি আমার কাজ আমার মত করছি। সেক্ষেত্রে কারোরই দরকার নেই লোকে কি বলল সেটাতে কান দেওয়ার।

লোকে তো অনেক কিছুই বলে কিন্তু তাদের কেউ তো এসে আমার বাসার বিলটা দিয়ে যায় না। তারা শুধু কথা-ই বলতে পারে। তাই সবাইকেই বলব, নিজের কাজে ফোকাস করা উচিত এবং সেটাতেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor