রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শর্ত মেনে চল, না হলে একাই লড়: ইউরোপকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশিত: ০১:৫০, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ |

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি এক কড়া অথচ কৌশলী বার্তা দিয়েছেন, যাকে বিশ্লেষকরা ‘ভালবাসার আবরণে চরম হুঁশিয়ারি’ হিসেবে দেখছেন। 

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে দেওয়া এই ভাষণে রুবিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ককে একটি অবিচ্ছেদ্য পারিবারিক বন্ধন হিসেবে বর্ণনা করলেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে ইউরোপকে নিজেদের মূল্যবোধ ও নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। 

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র কেবল সেই ইউরোপের সাথেই অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে ইচ্ছুক যারা খ্রিস্টীয় মূল্যবোধকে ধারণ করবে, সীমান্ত সুরক্ষিত রাখবে এবং বর্তমান জলবায়ু নীতি ও লিবারেল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করবে। অনেকটা ‘দম্পতিদের থেরাপি’র মতো সুরে রুবিও বার্তা দিয়েছেন— হয় নিজেদের পরিবর্তন করো, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র তোমাদের ত্যাগ করবে।

রুবিওর এই বক্তব্য মিউনিখের মঞ্চে উপস্থিত ইউরোপীয় মধ্যপন্থী নেতাদের জন্য ছিল একটি বড় ধাক্কা। সম্মেলনের আয়োজকরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে বিশ্ব এখন ‘রেকিং বল পলিটিক্স’ বা ধ্বংসাত্মক রাজনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। রুবিও সেই পথেই হেঁটেছেন এবং পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় নেতাদের উগ্র-ডানপন্থী বিরোধীদের এজেন্ডাকেই সমর্থন দিয়েছেন। 

এর আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউরোপের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বললেও রুবিও সেসব যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে নিজের দেশের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’ বা জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকেই বড় করে দেখিয়েছেন। তার ভাষণে গত বছরের বিতর্কিত গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না থাকলেও সম্পর্কের টানাপড়েনের আভাস ছিল স্পষ্ট।

এদিকে, সম্মেলনের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইউক্রেন সংকট। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তার বক্তব্যে রাশিয়ার নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরে ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা কৌশল তৈরির আহ্বান জানান। তিনি রুশ অগ্রাসনের ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান যে প্রতি কিলোমিটার ভূমি দখলের জন্য ১৫৬ জন ইউক্রেনীয় প্রাণ হারাচ্ছেন। 

জেলেনস্কি অনেকটা সোজাসাপ্টা ভাষায় পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যেকার কথিত ‘গোপন চুক্তির’ গুঞ্জনকে কটাক্ষ করেন এবং শান্তির নামে ইউক্রেনকে ছাড় দেওয়ার চাপের সমালোচনা করেন। তবে রুবিওর অবস্থানে এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন ইস্যুতে এখনও অনেকটা ধোঁয়াশা বজায় রাখছে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, মিউনিখ সম্মেলনটি আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের সম্পর্কের চরম ফাটলকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ইউরোপীয় নেতারা যখন আরও বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন। 

আগামী বছরের সম্মেলনের আগে ব্রিটেন বা ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের এই তিক্ত ও জটিল সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। 

ইউক্রেনের মতো দেশগুলো এখন কেবল এই আশায় দিন গুনছে যেন দুই পক্ষের এই মান-অভিমানে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে না যায়।

সূত্র: সিএনএন।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor