শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

ঢাকার চারটি আসনে দলীয় প্রধানদের মর্যাদার লড়াই

প্রকাশিত: ০৬:১২, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ |

সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা ঢাকার আসনে প্রার্থী হতে খুব একটা আগ্রহ দেখান না। নিরাপদ জয়ের জন্য বেশিরভাগ সময় তারা নিজ নিজ জন্মস্থান বা নিজ এলাকায় নির্বাচন করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অতীতে ঢাকার কয়েকটি আসনে দলীয় প্রধানদের প্রার্থিতার নজির থাকলেও পরাজয়ের ঘটনাও কম নয়।

তবে এবার সেই চিত্র বদলেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার চারটি আসনে চার বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান সরাসরি ভোটের মাঠে নেমেছেন। ফলে এই চার আসন ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে বাড়তি কৌতূহল ও আলোচনা।

ঢাকা-১৭ (গুলশান, বনানী ও ভাসানটেক) আসন থেকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ঢাকা-১৫ (কাফরুল) আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, ঢাকা-১১ (রামপুরা, বাড্ডা ও ভাটারা) আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর ও আদাবর) আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

চারটি বড় দলের শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণে এসব আসনের ফলাফলকে রাজনৈতিকভাবে ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলীয় প্রধানের জয় বা পরাজয় দলটির ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে—এ কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যেও বাড়তি সতর্কতা ও উদ্বেগ লক্ষ করা যাচ্ছে।

ঢাকা আসনভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই তারেক রহমানের পক্ষে বিএনপির নেতাকর্মীরা জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। গত ২৭ ডিসেম্বর প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এর আগে এই আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ করছিলেন বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। পরে তারেক রহমানের প্রার্থিতা নিশ্চিত হলে তিনি ভোলা-১ আসনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। এ আসনে তারেক রহমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান।

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান দীর্ঘদিন ধরেই প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে পরাজিত হন। এবার তিনি নিজ দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল ইসলাম মিল্টন।

ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। শুরুতে তার প্রচারণা তুলনামূলক কম থাকলেও গত ২৮ জুন এনসিপি জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়। জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নাহিদ ইসলামকে সমর্থন দেন। বর্তমানে জামায়াতের জনশক্তি নিয়ে মাঠে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। এ আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ড. এম এ কাইয়ুম।

ঢাকা-১৩ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার সম্মানে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এনডিএম-এর চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, যিনি প্রতীক বিধিমালা অনুযায়ী নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।

অতীতের নজির

ঢাকার আসনে দলীয় প্রধানদের জয়-পরাজয়ের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ঢাকা-৭ ও ঢাকা-১০—দুটি আসনেই পরাজিত হন। আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিপুল ভোটে জয়ী হন।

২০১৮ সালে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের ডা. শফিকুর রহমানও পরাজয়ের মুখ দেখেন। এসব উদাহরণই ঢাকার আসনকে দলীয় প্রধানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পেছনে বড় কারণ।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এবারের নির্বাচনে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দলীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। 

বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার আসনে পরাজয় দলীয় প্রধানদের জন্য ইমেজ সংকট তৈরি করতে পারে বলেই সাধারণত তারা নিরাপদ আসন বেছে নেন। অতীতে ভোটারদের আঞ্চলিক সমীকরণ ও রাজনৈতিক গণজোয়ার অনেক সময় ফলাফল নির্ধারণ করেছে। এবারের নির্বাচনেও সে ধরনের কোনো সমীকরণ তৈরি হয় কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor