সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর খবরটা কেন জানি আমাকে বেশ স্পর্শ করে গেল। কেননা মৃত্যুর ঠিক দুই দিন আগে আমি ওর ব্যোমকেশ মুভিটা দেখলাম। ওটাই ওর অভিনয় করা, আমার দেখা প্রথম মুভি। এর আগেও হিন্দিও দেখিনি।
কিন্তু সুশান্ত মাহেন্দ্র সিং ধোনির বায়োপিক করে গোটা ভারতজুড়ে বিশাল তারকা যদি আগেই হয়েছিল কিন্তু আমি সেটা দেখিনি।
যাহোক, ব্যোমকেশ আমার বেশ ভালো লেগেছিল, আর সেই অভিনেতা দুই দিন পরে মারা যাবে, এটা আমার কাছে কেন জানি স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সুশান্তের মৃত্যুর বিষয়টা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখল। গুগলে, ফেসবুকে ওর ছবি দেখলে বিশ্বাসই করতে মন চায় না ছেলেটা মারা গেছে।
মৃত্যুটার নানা দিক থেকে খটকা লাগার মতো, কেননা দুই দিন আগেই সুশান্তের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী মেয়েটা ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল। একটা সময় ঠিক করলাম, সুশান্তকে কেন্দ্র করে একটা উপন্যাস লিখব। এই উপন্যাসের শুরু ঢাকাতে, শেষ হবে বিহারের পূর্ণিয়াতে। সুশান্তের পৈতৃক বাড়ি।
লিখতে হলে তো পূর্ণিয়া যেতে হবে। উপায় খুঁজছিলাম। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে চলে গেলাম পূর্ণিয়ায়।
যাত্রাপথ সহজ করার জন্য ঢাকা থেকে দিনাজপুরের হিলি গেলাম। এরপর হিলি সীমান্ত দিয়ে ভারতে গেলাম।
সেখান থেকে প্রথমে দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট গেলাম। বালুরঘাট থেকে সরকারি পরিবহনের বাসে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে গেলাম। রায়গঞ্জ উত্তর দিনাজপুরের সদর দপ্তর। সেখান থেক বাস বদল করে জলপাইগুড়ির সড়ক দিয়ে পূর্ণিয়া মোড় নেমে গেলাম। এবার সরাসরি পূর্ণিয়ার বাস। মোড় থেকে চলে গেলাম পূর্ণিয়ায়। সারাদিনের যাত্রাশেষে হোটেল খুঁজতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছিলাম। অধিকাংশ হোটেলে বিদেশি অ্যালাউ না। পরে একটা মানসম্মমত হোটেলে গিয়ে উঠলাম।
খেয়াল করলাম শহরটা সুশান্তক মনে রেখেছে। একটা শহরের নাম রেখেছে সুশান্ত সিং রাজপুত সড়ক। এখানে বিভিন্ন জায়গার নামের সঙ্গে যুক্ত ‘চক’ শব্দটা। তেমনই একটি মোড়ের নাম ফোর্ড কম্পানি চক, সেটার নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে ‘সুশান্ত সিং রাজপুত চক’।
রাতে পূর্ণিয়া শহরের হোটেলে থেকে পরের দিন সুশান্তের বাড়ি গেলাম। পূর্ণিয়া শহর থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা এই বাসে ৪৮ কিলোমিটার গেলে বারহারাকোঠি সাবডিস্ট্রিক্ট পাওয়া যাবে। বাসস্ট্যান্ড থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে মালদিহা নামের এক গ্রাম। এমন একটি দুর্গম অঞ্চল যে খুব সহজে বাস পাওয়া যায় না। আর বারহারাকোঠি সাবডিস্ট্রিক্ট থেকে কোনো প্রকার যানবাহন পাওয়াই মুশকিল। মালদিয়া গ্রামটাই সুশান্ত সিং রাজপুতের পৈতৃক বাড়ি। এখন এই বাড়িতে বসবাস করেন সুশান্তের বড় চাচা। বাড়িতে সুশান্তের স্মৃতিচিহ্ন, কয়েকটা ছবি রয়েছে দেয়ালে। সেসব ছবিতে মালা পরানো। পরিবারের অনেকের সঙ্গেই কথা হলো। সুশান্ত সিং রাজপুতের নানা স্মৃতি জড়ানো জিনিসপত্র বাড়িতে। সুশান্ত সুযোগ পেলেই চলে আসেন এখানে।
সর্বশেষ সুশান্ত এসে যে গাড়িটা চালিয়েছেন, সেটা বাড়ির সামনে দাঁড় করানো। এখানে এসেই সুশান্ত মাঠে নেমে পড়তেন, ক্রিকেট খেলতেন পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে। অনেকেই বলছে, সুশান্ত যে অনেক বড় একজন তারকা ছিল সেটা মনেই হতো না। কারণ সে এসে সবার সঙ্গে সাধারণের মতোই মিশে যেত।
সুশান্তের চাচাতো ভাই পান্না সিং রাজপুত বললেন, ‘সুশান্তকে আমরা চিনি, সে কখনো আত্মহত্যা করতেই পারে না। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।’ কেন মেরে ফেলা হয়েছে, এর খুব সহজ জবাব রয়েছে পান্নার কাছে। বললেন, ‘বলিউডে অন্যান্য নায়কের উত্থানের তুলনায় সুশান্তের উত্থান ছিল দ্রুত। অনেকেই বুঝে গিয়েছিল সুশান্ত অনেকের মাথাব্যথার কারণ, তাই তাকে সরিয়ে ফেলো, সরিয়ে ফেলা হলো। সুশান্ত বেঁচে থাকলে আজ অনেক বড় সুপারস্টার স্ক্রিন থেকে সরে যেত, হারিয়ে যেত।’
সুশান্তের মকৃত্যুর পেছনে, পান্না সিং রাজপুত বলিউডের সালমান খানকে যেমন ইঙ্গিত করলেন, তেমন ইঙ্গিত দিলেন গ্যাংস্টারদেরও। এটা একটা খুব কঠিন সফর ছিল। পূর্ণিয়া থেকে ফিরে সেই উপন্যাসটা লিখেছি। গত বইমেলায় সেটা প্রকাশও হয়ে গেছে।
Publisher & Editor