মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষায় বিপাকে পড়তে যাচ্ছে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ। মিত্রদের বিপক্ষে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে ইউরোপের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে তাকে চাপে ফেলার এক কৌশল। ইউরোপিয়ান নেতাদের চিন্তায় এখন ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ বয়কট।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠেয় এই বিশ্বকাপ ট্রাম্পের জন্য বড় এক ‘সফট পাওয়ার’।
ইউরোপের বড় দলগুলো যদি টুর্নামেন্টে না খেলে, তাহলে বিশ্বকাপের ক্রীড়া ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন অনেক রাজনীতিক ও বিশ্লেষক।
বাইডেন প্রশাসনের সময় জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা থাকা অ্যাডাম হজ বলেন, ‘ট্রাম্পের কাছে লিভারেজ মানেই শক্তি। আর বিশ্বকাপ যে তিনি কতটা গুরুত্ব দেন, তা স্পষ্ট। ইউরোপের অংশগ্রহণই এমন এক চাপের জায়গা, যা ট্রাম্প গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন।
এদিকে, ট্রাম্প আপাতত ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। তবে ইউরোপের অনেক রাজনীতিক মনে করছেন, আবার মত বদলালে বিশ্বকাপ বয়কটই হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
তবে বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় সরকাররা আপাতত সরাসরি কোন অবস্থান নিচ্ছে না। জার্মানির ক্রীড়া বিষয়ক স্টেট সেক্রেটারি ক্রিস্টিয়ানে শেন্ডারলাইন এএফপিকে বলেন, ‘কোনো বড় ক্রীড়া ইভেন্টে অংশ নেওয়া বা বয়কট করার সিদ্ধান্ত রাজনীতিবিদদের নয়, সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া সংস্থাগুলোর।
ফ্রান্সের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, এই মুহূর্তে বিশ্বকাপ বয়কটের কোনো সরকারি পরিকল্পনা নেই।
এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে— এই সিদ্ধান্ত এখন ইউরোপের জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর হাতে। এখন পর্যন্ত যেসব ইউরোপীয় দেশ বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে, তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় এক ডজন ফুটবল কর্তার সিদ্ধান্তেই ট্রাম্পের ‘বিশ্বকাপ স্বপ্ন’ ভেস্তে যেতে পারে। বসন্তে প্লে-অফ শেষে আরও চারটি ইউরোপীয় দল যুক্ত হবে টুর্নামেন্টে।
স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি রাফায়েল লাউসান, ইংল্যান্ডের ডেবি হিউইট কিংবা নেদারল্যান্ডসের ফ্র্যাঙ্ক পাও-এর মতো নামগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত না।
তবে এই মুহূর্তে তারা ইউরোপীয় কমিশনের তথাকথিত ‘ট্রেড বাজুকা’র চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারেন। কারণ তাদের হাতেই আছে ট্রাম্পের ‘বিশ্বকাপ স্বপ্ন’।
ফিফার গভর্ন্যান্স কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মিগেল মাদুরো বলেন, ‘ইউরোপীয় দল ছাড়া বিশ্বকাপ ক্রীড়াগত দিক থেকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ছাড়া শীর্ষ ১০ দলের বেশিরভাগই ইউরোপের। এতে ফিফার আর্থিক ক্ষতিও হবে বিশাল।’
এর আগেও ইউরোপের ফুটবল কর্তারা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এলজিবিটিকিউ অধিকার ও অভিবাসী শ্রমিকদের ইস্যুতে সরব ছিলেন। আয়ারল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গাজা শান্তিচুক্তির আগে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও তুলেছিল।
সম্প্রতি ডাভোসে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বুধবার দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন না। তবে একই সঙ্গে দ্বীপটি অধিগ্রহণের ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ‘তাৎক্ষণিক আলোচনা’ চেয়েছেন তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটোর সঙ্গে একটি কাঠামোগত সমঝোতা হয়েছে।
তবে এসব বক্তব্য ইউরোপীয় রাজনীতিকদের পুরোপুরি শান্ত করতে পারেনি। ফ্রান্সের বামপন্থী সংসদ সদস্য এরিক কোকেরেল সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, ‘যে দেশ প্রতিবেশীদের হুমকি দেয়, গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলে, আন্তর্জাতিক আইন ভাঙে—সেখানে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার কথা কি কল্পনা করা যায়?’
জার্মানির প্রভাবশালী রক্ষণশীল রাজনীতিক রোডেরিশ কিজেভেটারও বলেছেন, ‘ট্রাম্প যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি বাস্তবায়ন করেন এবং ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন, তাহলে ইউরোপের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ কল্পনা করা কঠিন।’
এর আগে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপ বয়কটের আহ্বান জানিয়েছে দেশ দুটির রাজনৈতিক মহল থেকে।
কয়েকজন ব্রিটিশ সাংসদ পরামর্শ দিয়েছেন, দেশের ক্রীড়া নীতি ও অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় দলগুলোর এ ধরনের আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নেওয়া উচিত কি না তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
Publisher & Editor