মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার, নীরবে বাড়ছে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি

প্রকাশিত: ০৫:৫৬, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৩

আমাদের অনেকেরই দিন শুরু হয় ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। সারা দিন নোটিফিকেশন স্ক্রল করা, আর রাতে অন্ধকার ঘরে শুয়ে ফোনের আলোয় সময় কাটানো— এসব এখন প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। স্মার্টফোন নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ।

কিন্তু বিষয়টি শুধু আসক্তি বা মনোযোগ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কখন ফোন ব্যবহার করছি, কতক্ষণ ব্যবহার করছি, স্ক্রিন থেকে কী ধরনের আলো নির্গত হচ্ছে এবং সেই কনটেন্টের সঙ্গে আমরা মানসিকভাবে কতটা জড়িয়ে পড়ছি— সব কিছুই আমাদের ঘুম ও স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। চলুন, জেনে নিই ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ কেন করবেন।

মস্তিষ্কের ‘নাইট শিফট’ ব্যাহত হয়
স্মার্টফোনের নীল আলো দিনের আলোর মতো আচরণ করে এবং মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। এই হরমোনই মস্তিষ্ককে ঘুমের সংকেত দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর ঠিক আগে স্ক্রিন দেখলে ঘুম আসতে দেরি হয়।

প্রকৃত ঘুমের সময় কমে যায়
১ লাখ ২২ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার করলে ঘুমের সময় ও মান দুটোই কমে যায়। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮ মিনিট কম ঘুম হয়। শুনতে কম মনে হলেও, দীর্ঘদিন ধরে এটি বড় ধরনের ঘুমের ঘাটতিতে রূপ নিতে পারে।

অনিদ্রার ঝুঁকি বেড়ে যায়
নরওয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিছানায় শুয়ে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করলে অনিদ্রার লক্ষণ প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং ঘুমের সময় প্রায় ২৪ মিনিট কমে যায়। এটি শরীরের স্বাভাবিক ঘুম নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ব্যাহত করে।

রাতের ফোন ব্যবহার ঘুম ভেঙে দেয়
অনেকে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ফোন ধরেন। গবেষণায় দেখা যায়, এতে ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এমনকি অল্প সময়ের জেগে ওঠাও গভীর ও পুনরুদ্ধারমূলক ঘুমের ক্ষতি করে।

মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে
খারাপ ঘুম মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা বাড়াতে পারে। আবার এই মানসিক চাপই রাত জেগে আরো বেশি ফোন ব্যবহারে প্ররোচিত করে। এভাবে একটি ক্ষতিকর চক্র তৈরি হয়।

উদ্বেগ ও আবেগগত অস্থিরতা বাড়ে
ঘুমানোর আগে স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে অস্থিরতা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, বিরক্তি ও মানসিক অস্বস্তির সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। রাতের বেলা সোশ্যাল মিডিয়া বা খবরের আপডেট মানসিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।

শরীর পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে পারে না
ঘুম ও ফোন ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাতে ফোন ব্যবহার করলে হার্ট রেট বেশি থাকে এবং ঘুমের সময় জেগে থাকার পরিমাণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ শরীর বিশ্রামের অবস্থায় যেতে পারে না।

ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে
ঘুমের ব্যাঘাত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ও গ্লুকোজ বিপাকে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে খারাপ ঘুম উচ্চ বিএমআই, ওজন বৃদ্ধি ও মেটাবলিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

চিন্তাশক্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যায়
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়। দিনের বেলায় ঝিমুনি, খিটখিটে মেজাজ ও কাজের উৎপাদনশীলতা কমে যায়।

ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রাখা শুধু শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি আপনার ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য ও বিপাকীয় সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। নাইট মোড বা ব্লু লাইট ফিল্টার ব্যবহার, রাতে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ চালু করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর ফোন হাতের নাগালের বাইরে রাখা—এসব অভ্যাস সুস্থ জীবনযাপনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor