শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

তারা একটি দুটি তিনটি করে এলো

প্রকাশিত: ০২:২২, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৩৬

বাঘের বাড়ি সুন্দরবন। আমরা বসে আছি বেতমোর গাঙের হোমরা খালের মুখে। এই খালেই একবার আমাদের কয়েকজন বন্ধু বাঘ মামার দেখা পেয়েছিল। তখন বিকেল।

বাঘ মামা একটা গাছের ডালে আরাম করছিল—তোমরা যেমন দোলনায় দোল খাও।
তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বাঘ মামাও হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই দেখা পাওয়ার আশা নেই।

তবে কিভাবে বাঘ মামাকে পাওয়া গিয়েছিল, তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আমরা অপেক্ষা করছিলাম খালে ঢুকব বলে। ওই খাল দিয়ে আরো একটা বড় লঞ্চ এদিকে আসছে। দুটি লঞ্চ পাশাপাশি পার হতে পারবে না বলেই অপেক্ষা।

অবশেষে লঞ্চটা বেরিয়ে এলো। রওনা হলাম।
সুন্দরবনের খাল আর নদীগুলোই চলাচলের রাস্তা। এখানে কোনো ধুলাবালি নেই। আকাশ পরিষ্কার।

মেঘ না থাকলে তারায় তারায় ভরে যায় আকাশটা। আজও তা-ই। আকাশকে মনে হচ্ছে সাদা ফুলের বাগান। কোনোটা স্থির, কোনোটা মিটিমিটি করে। কোনোটা সাদা, কোনোটা কমলা, কোনোটা আবার হালকা নীলাভ। আকাশের দিকে তাকিয়ে তারার মেলা দেখছিলাম। চারদিক থেকে আকাশটা নেমে এসেছে একেবারে মাথার ওপর। মনে হচ্ছে, হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব, কিংবা একটা আঁকশি থাকলে পাকা আমের মতো পেড়ে আনা যাবে একেকটা তারা। এরই মধ্যে হঠাৎ     চমকে উঠলাম—আরে, তারা ভরা পুরো আকাশ নেমে এসেছে বনের মাথায়, গাছের শাখায় শাখায়!
না, এরা আকাশের তারা নয়; বনের জোনাকি। কি, জোনাক পোকার নাম শুনেছ? দেখেছ কখনো? মনে হয়, না। শহরে যারা থাকো, তারা দেখবে কোথা থেকে। আমিই দেখলাম সেই কত দিন পর! তা-ও আবার সুন্দরবনে এসে।

মনে পড়ে গেল আহসান হাবীবের কবিতা ‘জোনাকিরা’। ‘তারা তারা—একটি দুটি তিনটি করে এলো তখন—বৃষ্টি-ভেজা শীতের হাওয়া বইছে এলোমেলো...একটি দুটি তিনটি করে এসে/এক শো দু শো তিন শো করে/ঝাঁক বেঁধে যায় শেষে/...তখন—ঝাউয়ের শাখায়—পাখির পাখায়/হীরে-মানিক জ্বলে।...তখন—থমকে দাঁড়ায় শীতের হাওয়া/চমকে গিয়ে বলে—/তোমরা কি ভাই নীল/আকাশের তারা? আলোর পাখি নাম জোনাকি/জাগি রাতের বেলা/নিজকে জ্বেলে এই আমাদের/ভালোবাসার খেলা।’

জোনাক পোকার ইংরেজি নামটা কিন্তু দারুণ! ফায়ারফ্লাই, যার বাংলা করলে হয় আগুনে মাছি। অর্থাৎ     যে মাছি আগুন জ্বালায়। তবে এর বাংলা নাম তমোমণি। জোনাক পোকার আরো একটা বাংলা নাম আছে। নামটা বেশ খটমটে—‘খদ্যোত’। এটা দুটি সংস্কৃত শব্দের মিলিত রূপ। ‘খ’ মানে আকাশ আর ‘দ্যোতি’ মানে আলো। অর্থাৎ     আকাশে আলো দেয় যে। এটা শুনে তোমরা হয়তো জোনাকিকে এখন তারা-পোকা বলে বসবে।

আমাদের ছোটবেলার সন্ধ্যাটা দারুণ জমে উঠত এই জোনাক পোকার সঙ্গে। তখন বিদ্যুৎ     ছিল না গ্রামে। বাড়ির আশপাশে আর রাস্তার ধারে প্রচুর ঝোপঝাড়। সন্ধ্যা হলেই ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে উঠত। কারো বড়িতে প্রদীপ, কারো কুপি আর কারো বাড়িতে হারিকেন। ওদিকে ঝোপঝাড়ে বাতি জ্বালাত জোনাকিরা। এখনকার শহরে চায়নিজ রেস্টুরেন্ট বা দামি হোটেলগুলোর সামনে বা টবে রাখা গাছে রংবেরঙের যে মরিচ বাতিগুলো জ্বলে, অনেকটা তেমন। মরিচ বাতি দিয়ে বাড়িঘর বা গাছ সাজানোর ধারণা কিন্তু এই জোনাক পোকার আলো থেকেই এসেছে। আমরা জোনাকি ধরে পলিথিনের ঠোঙায় ভরে ঘরের কোণে ঝুলিয়ে রাখতাম, যেমন তোমরা লাগাও মরিচ বাতি।

এরা দল বেঁধে আলোর খেলা কেন খেলে জানো? এই আলো আসলে তাদের ভাষা। জোনাক পোকা কথা বলতে পারে না। তারা আলো জ্বেলেই ভাব বিনিময় করে। এদের আলো কিন্তু বেশ নরম নীলাভ। অর্থাৎ     আলোতে তাপ নেই। এতে আলট্রাভায়োলেট বা ইনফ্রারেড তরঙ্গ নেই। আলোর রং হলুদ, সবুজ বা ফিকে লালও হতে পারে। যদিও যেখানে আলো সেখানেই উত্তাপ, কিন্তু জোনাকির আলো চাঁদের আলোর মতো নরম—উত্তাপহীন।

জোনাকির শরীরে লুসিফেরাস ও লুসিফেরিন নামের দুটি রাসায়নিক পদার্থ থাকে। সেগুলোই এই আলোর উৎস। লুসিফেরাস আলো জ্বালায়। আর লুসিফেরিনের কাজ হচ্ছে আলোর তাপ কমিয়ে ঠাণ্ডা করা এবং আলোর বিচ্ছুরণ ঘটানো। জোনাক পোকা যেন প্রকৃতির ল্যাম্পপোস্ট। কি, দারুণ না ব্যাপারটা?

জোনাকিরা ল্যামপিরিডি পতঙ্গ পরিবারের এক ধরনের গুবরে পোকা। এদের বর্গ হলো কলিওপ্টেরা। এরা মূলত পাখাওয়ালা গুবরে পোকা। এরা শিকারের উদ্দেশ্যে এবং মিলনের জন্য সঙ্গীর খোঁজে আলো জ্বালায়।

পৃথিবীতে প্রায় দুই হাজার প্রজাতির জোনাকি আছে। প্রত্যেকের আলোর ধরন আলাদা। এরা আলো দেখেই একে অপরকে চেনে। পরিচিত হয়। সঙ্গী বাছাই করে। অনেক প্রজাতিতেই নারী-পুরুষ উভয় পতঙ্গ উড়তে পারে, কিন্তু কিছু প্রজাতির স্ত্রীরা উড়তে অক্ষম। প্রকৃতির খুদে একটা প্রাণ জোনাকি। অথচ কী গভীর তার জীবনরহস্য!

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor