শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

কৃষ্ণচূড়া, জোড়া দোয়েল

প্রকাশিত: ০৬:৩১, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৪৫

‘আমাকে আজ তাড়াতাড়ি অফিসে যেতে হবে, আমি উঠছি বাবা, তোমরা নাশতা খাও’, কাজল ন্যাপকিন দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলে।

‘এক পিস পাউরুটি আর একটা কলা খেয়েই নাশতা হয়ে গেল? ব্যাপারটা কী, এত তাড়া কিসের?’ জানতে চান বাবা আবু কায়সার। প্রতিদিন সকালে সবাইকে নিয়ে তিনি প্রাতরাশ করেন।

‘আজ আমাদের বোর্ড মিটিং আছে বাবা, সকাল এগারোটায়।

আমাকে আগেই গিয়ে কাগজপত্র, ফাইল সব গুছিয়ে রাখতে হবে। বোর্ড মিটিং-এ আমাকে থাকতেই হয়।’ কাজল একটি বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তার ওপর অনেক দায়িত্ব।

ছেলে কাজল, বৌমা মমতা ও নাতি তিন বছরের চন্দনকে নিয়ে ষাটোর্ধ্ব আবু কায়সারের সংসার। তার স্ত্রী সানু প্রয়াত হয়েছেন চার বছর আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে। মমতাই এখন সংসার সামলায়। শ্বশুর, স্বামী ও সন্তান—তিনজনের সেবাযত্ন করতে হয় তাকে।

আবু কায়সার সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন কয়েক বছর আগে।
ঢাকা শহরের পূর্বপ্রান্তে বাসাবো এলাকায় তার বাড়ি। পাঁচ কাঠা জমির ওপর দোতলা বাড়িটি নিজেই তৈরি করেছেন। দোতলার একটি ফ্ল্যাটে তিনি সপরিবারে থাকেন। অন্য তিনটি ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

প্রতিদিন সকাল ছয়টায় আবু কায়সারের ঘুম ভাঙে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন। মুখ-হাত ধুয়ে একটি সুতি চাদর গায়ে জড়িয়ে ঘরের পাশে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ান। উপভোগ করেন শান্ত-স্নিগ্ধ-সুন্দর সকাল। এই নিয়মের ব্যতিক্রম কোনো দিনই হয় না, কয়েক বছর ধরে এমনই চলছে।

বেডরুমের পাশের ছোট বারান্দাটি আবু কায়সারের সব চেয়ে প্রিয় জায়গা। স্ত্রী সানুকে নিয়ে তিনি এখানে বসতেন, একসঙ্গে চা খেতেন। সানু চলে যাওয়ার পর তিনি একাই এসে বসে থাকেন। তাঁকে নিঃসঙ্গ বলা যাবে না, নাতি চন্দন সব সময়ে তাঁর পাশে থাকে, খেলাধুলা করে। বৌমা মমতাও রান্নাঘরের কাজ সেরে শ্বশুরের কাছে এসে বসে, গল্প করে। ছেলে কাজল অফিস থেকে এসেই আগে বাবার সঙ্গে দেখা করে, তারপর নিজের ঘরে যায়। সানু না থাকলেও ছেলে কাজল, বৌমা মমতা আর নাতি চন্দন কায়সার সাহেবের নিঃসঙ্গতা দূর করেছে। তার পরেও আবু কায়সারের মনে হয় তিনি একা, তাঁর মনে শুধু হাহাকার।

আবু কায়সারের প্রিয় সময় সকালবেলা। সকালে তাঁর সঙ্গী বারান্দার সামনের কৃষ্ণচূড়াগাছ। গাছটা লাল ফুলে ছেয়ে থাকে। আবু কায়সার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেই গাছের ছোট ছোট ডাল, লাল ফুল সব নড়েচড়ে ওঠে, দুলতে থাকে এদিক থেকে ওদিকে। গাছের ডালে একজোড়া দোয়েল পাখি রোজই বসে থাকে। কায়সারকে দেখলেই উড়ে যায় অন্য ডালে, আবার ফিরে আসে। লাল কৃষ্ণচূড়া আর জোড়া দোয়েলের খেলা নিঃসঙ্গ কায়সারকে মুগ্ধ করে রাখে।
 
দুই.

ফুল, পাখি, প্রকৃতির প্রতি আবু কায়সারের আকর্ষণ তাঁর শৈশবকাল থেকেই। পৈতৃক বাড়ির জমিতে বিভিন্ন গাছের চারা লাগাতেন, মাটির টবে ফুলের গাছ। বোটানিতে অনার্স নিয়ে এমএসসি পাস করেছেন। সরকারি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করে অবসরে গেছেন। বোটানি নিয়ে পড়াশোনা আর গবেষণা করতে গিয়ে গাছপালার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। একই সঙ্গে পাখির জগৎও তাঁকে আকর্ষণ করে প্রবলভাবে। গাছপালার সঙ্গে পাখির সুনিবিড় সম্পর্ক। পাখি ও গাছের ছবি তোলার জন্য কত জায়গায় তিনি গেছেন। প্রকৃতিপ্রেমিক অধ্যাপক আবু কায়সার সুপরিচিত।

বাসাবোর বাড়িতে জমি কম হলেও যতটা সম্ভব তিনি গাছ লাগিয়েছেন। তাঁর ছাদ বাগানটিতে সুন্দর ফুলের গাছ, ফলের গাছ সবই আছে। স্ত্রী সানু একটি কৃষ্ণচূড়ার চারা এনে রোপণ করেছিলেন দোতলার বারান্দার নিচের মাটিতে। কয়েক বছরের মধ্যেই গাছটি মোটাতাজা হয়ে ফুল ফোটাতে শুরু করে। বেডরুমের পাশেই বারান্দা, আর বারান্দার পাশেই কৃষ্ণচূড়া। বিছানায় শুয়েই বারান্দার পাশে ফুলে ফুলে ভরা গাছটি দেখা যায়। আবু কায়সার স্ত্রীকে নিয়ে জানালা দিয়ে লালফুল দেখতেন, পাখির আনাগোনায় মন ভরে যেত। সকালে বারান্দায় বসে চা খাওয়ার অভ্যাস এখনো আছে। সানু নেই, কিন্তু বারান্দায় বসার অভ্যাসটা যায়নি।

একদিন সকালে মমতা শ্বশুরের জন্য চা এনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। ‘বৌমা, দেখো জোড়া দোয়েলের পাশে আজ আরো একজোড়া দোয়েল। লাল কৃষ্ণচূড়ার পাশে ওদের কত সুন্দর লাগছে। ওই দেখো, ওদিকের ডালে, একজোড়া বুলবুলি-কালো বুলবুলির লেজের নিচে লাল। কী সুন্দর, তাই না? শালিক পাখিও তো আছে কয়েক জোড়া।’

মমতা অবাক হয়ে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে থাকে। দোয়েল, বুলবুলি, শালিক, কোনো পাখিই সে দেখছে না। অথচ তার শ্বশুর কত পাখি দেখছেন।

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। সব পাখিই সুন্দর, ফুলের পাশে আরো সুন্দর লাগে। আপনি চা খান বাবা, পরে নাশতা দিচ্ছি।’ আবু কায়সারের সংসারে সানুর অভাব অনেকটাই পূরণ করেছে বৌমা মমতা। তবু সানুর মতো আর কেউ হবে না।

তিন.

রাতে খাওয়ার পর আবু কায়সার ঘুমাতে গেলেন তাঁর ঘরে। চন্দনও ঘুমিয়ে পড়েছে। মমতা ও কাজল ড্রইং রুমে বসে টিভির খবর শুনছে। কাজল লক্ষ্য করে মমতার নজর টিভির দিকে নেই, কী যেন ভাবছে।

‘কী হয়েছে মমতা, কী ভাবছো?’

‘বাবাকে নিয়ে একটু চিন্তায় আছি। তুমি খেয়াল করেছো নিশ্চয়ই বাবা ব্যালকনিতে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকেন, কত কী ভাবেন। আজ সকালে আমাকে বললেন, কৃষ্ণচূড়া গাছে কত লাল ফুল ফুটে আছে, ফুলের পাশে জোড়া দোয়েল ওড়াউড়ি করছে, বুলবুলি, শালিক এসব পাখিও উনি দেখেন। কিন্তু আমি তো কিছুই দেখি না। ব্যাপারটা কী? বাবা দেখেন, আমি দেখি না, এটা কী করে হয়?’

মমতার কথা শুনে কাজল চুপ করে থাকে। তাকেও বাবা বলেছেন কৃষ্ণচূড়া আর জোড়া দোয়েলের কথা। মমতার মতো সেও কিছু দেখতে পায় না।

‘ফুল, পাখি, এসব যদি থাকত, তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু কৃষ্ণচূড়া গাছটাই তো নেই। মা মারা যাওয়ার পর গাছটাও একদিন প্রচণ্ড ঝড়ে ভেঙে পড়েছে, মরে গেছে, এখন গাছ নেই, ফুল নেই, পাখিও নেই। অথচ বাবা ঠিকই তাদের দেখছেন।’

‘আমার মনে হয় একজন মানসিক রোগের চিকিৎসক অথবা মনস্তত্ববিদের সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার। অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে।’

‘ঠিকই বলেছ মমতা। আমি কালই আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক ডাক্তার সরকারের সঙ্গে কথা বলব। তিনি বাবার মতোই প্রবীণ, বাবার চিকিৎসা তিনিই করেন। বাবার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্ক।’

পরদিন সন্ধ্যায় কাজল ডাক্তার সরকারের চেম্বারে গিয়ে তাঁকে সব খুলে বলে। ‘কৃষ্ণচূড়াগাছ নেই, ফুল নেই, পাখি নেই—অথচ বাবা রোজ দেখেন। এ কী করে হয় আঙ্কেল? এটা কী কোনো মানসিক রোগ?’

‘এখনই মানসিক রোগ বলা ঠিক হবে না। আগে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। পরশু শুক্রবার সকালে আমি তোমাদের বাসায় যাব কায়সারকে দেখতে। আমি বেড়াতে যাব, চা-কফি খাব। ওকে বুঝতে দিয়ো না আমি কেন যাচ্ছি।’

শুক্রবার সকালে ডাক্তার সরকার বাসাবো গেলেন আবু কায়সারকে দেখতে। পুরনো বন্ধুকে দেখে খুব খুশি হলেন আবু কায়সার। তাঁকে নিয়ে বসলেন ড্রইংরুমে।

‘তুমি হঠাৎ আমার বাসায়? পথ ভুল করে এসেছ, নাকি কাজল তোমাকে ডেকেছে আমাকে দেখতে?’

‘না, আমি নিজেই এসেছি। অনেক দিন তোমার সঙ্গে দেখা হয় না, তাই এখন এসেছি বৌমার হাতের এক কাপ চা খেতে।’

‘ভালোই করেছ। তা একা কেন, তোমার বৌকে সঙ্গে আনলে পারতে।’

‘ও ব্যস্ত আছে, কোথায় যেন যাবে। আর একদিন নিয়ে আসব।’

মমতা একটি ট্রেতে দুই কাপ চা আর কেক-মিষ্টি নিয়ে এসেছে। ডাক্তার সরকার বললেন, ‘এখানে নয়, আমি চা খাব কায়সারের বেডরুমের পাশের বারান্দায় বসে।

সকালের মিষ্টি রোদে বসে চা খেতে ভালোই লাগবে।’ সেখানেই চা দেওয়া হলো। একটি ছোট টেবিলে চা-মিষ্টি রেখে পাশাপাশি দুটি চেয়ারে দুজন বসলেন। কায়সারের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিলেন ডাক্তার সরকার।

‘তোমার ঘুম কেমন হয় রাতে? টানা ছঘণ্টা ঘুম হয় তো?’

‘তা হয়। তবে গভীর ঘুম হয় বলা যাবে না। একটু খুটখাট শব্দ হলেই ঘুম ভেঙে যায়। যখনই ঘুমাই না কেন, সকাল ঠিক ছটায় ঘুম ভাঙবেই।’

‘তারপর কী করো? লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে যাও?’

‘না, কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকি। তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে যাই। মুখ-হাত ধুয়ে এখানে বারান্দায় এসে বসি। চা না আসা পর্যন্ত কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখি, লাল ফুল, কালো দোয়েল সব দেখি। আমার মনটা ভালো হয়ে যায়। ওই দেখো জোড়া দোয়েল, লাল ফুলের পাশে চুপচাপ বসে আছে। আবার এপাশে দেখো একজোড়া কালো বুলবুলি। কী সুন্দর, তাই না?’

‘কিন্তু আমি তো কিছুই দেখছি না কায়সার। কোথায় গাছ, কোথায় পাখি? সামনে তো সবই ফাঁকা।’

‘আছে, সব আছে, তুমি দেখছ না। আমি ঠিকই দেখি। শোনো ডাক্তার, তোমার চোখে সমস্যা আছে। তুমি আজই চোখের ডাক্তারের কাছে গিয়ে চোখ দেখাও।’

‘ঠিক আছে, চোখ দেখাব। তুমি এখন চা খাও।’

চা খেতে খেতে ডাক্তার সরকার বন্ধু কায়সারের সমস্যা নিয়ে ভাবলেন। একটা মানসিক সমস্যা তাঁর চলছে সন্দেহ নেই। কিন্তু কেন?

‘জানো ডাক্তার, জোড়া দোয়েল দেখলে আমার ভালো লাগে, আবার খারাপও লাগে। সব পাখি জোড়ায় জোড়ায় উড়ছে, আনন্দ করছে। শুধু আমার জোড়াটা ভেঙে গেল। সানু চলে যাওয়ার পর আমি বেজোড় হয়ে গেছি। আমি এখন নিঃসঙ্গ পাখি।’

ডাক্তার সরকার চুপ করে রইলেন। কিছু বলার তো নেই। তিনি বুঝতে পারলেন আবু কায়সারের বেদনা কোথায়।

কায়সারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ডাক্তার সরকার বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে কাজল ও মমতাও এসেছে। গাড়িতে ওঠার আগে ডাক্তার সরকার বললেন, ‘কায়সার কোনো মানসিক রোগী নয়। সে সুস্থ আছে। তবে স্ত্রী সানুর মৃত্যু তাঁর মনে বড় রকমের আঘাত দিয়েছে। পুরনো দিনের স্মৃতি তাঁর মন থেকে যাচ্ছে না। তাই সে হারিয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়া, জোড়া দোয়েল সব দেখে। তাঁর মন সানুকে খুঁজে বেড়ায়। এটা যেহেতু কোনো রোগ নয়, এর ওষুধও নেই। তোমরা ওকে আরো বেশি সঙ্গ দাও, ওর পাশে থাকো। সম্ভব হলে বাইরে কোথাও ওকে নিয়ে বেড়াতে যাও। ওর একটু চেঞ্জ দরকার আছে। চিন্তা কোরো না, ঠিক হয়ে যাবে। আর একটু সময় দিতে হবে।’

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor