শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

৭ নভেম্বর তবে ‘ওয়ান ম্যান শো’রই দিন

প্রকাশিত: ০৮:৪৯, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ৬

দিনের শুরুতে অন দিস ডে জানান দিল, তিন বছর আগের আজকের এই দিনে ক্রিকেট দেখেছিল অবিস্মরণীয় এক ইনিংস। ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি, এক ইনিংসেই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন অমরত্বকে। তার ঠিক তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে এই ৭ নভেম্বর ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে তাওহিদ হৃদয় যা করলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয়ে থাকবে সোনার হরফে।

২০২৩ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ‘ওয়ান ম্যান শো’র অনন্য এক নজির গড়ে বসেছিলেন। ৯১ রানে ৭ উইকেট নেই, সেখান থেকে ২০১ রানের অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়েছিলেন। তাওহিদ হৃদয় আজ যা করলেন, সেটাকে আপনি ‘ওয়ান ম্যান শো’ না বলে পারবেন?

তিনি উইকেটে যখন আসছেন, তখন দলের ২ উইকেট নেই। ওপেনার সাদমান ইসলাম চোটের কারণে নামতে পারবেন না, জানা ছিল আগে থেকেই। সে হিসাব মাথায় রাখলে উইকেটের সংখ্যাটা চাইলে ২ এর জায়গায় ৩-ও ধরে রাখলে ভুল হয় না। 

উইকেটে এসে একের পর এক অভিজ্ঞ ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিল দেখলেন। শুরুতে নাজমুল হোসেন শান্তকে বিদায় নিতে দেখলেন। আজ দিনের শুরুতে মুশফিকুর রহিম, এরপর লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ… মিছিলটা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছিল। এদের সবাই অন্তত হৃদয়ের চেয়ে অভিজ্ঞ, ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছেন, সবচেয়ে কম টেস্টে খেলা হাসানেরও অভিজ্ঞতা ছিল ১৯ ম্যাচের।

অভিজ্ঞতার মূল্য কী, সেটা আগের টেস্টেই বুঝেছেন। মাত্রই একটা ৩৫০ রানের ইনিংস খেলে এসেছিলেন, যা আবার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের রেকর্ডও। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ডিফ্রেন্ট বল গেমটা ধরতে একটু যেন সময় লেগেছিল। সে সময়েই দুবার আউট হয়েছেন, মিরপুরের উইকেট বিচারে ইন্টেন্ট নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও শট সিলেকশন নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারত, এবং সেটা উঠেছেও। মাসখানেক আগে ইতিহাস গড়া তাওহিদ হৃদয় ভিলেনই বনে গিয়েছিলেন সেদিন। সঙ্গী ছিল ফিসফাসও, সেই ৩৫০ কি তবে ফ্লুক ছিল? এমন প্রশ্নও উঠছিল।

আজ যেন সেসব অবহেলা দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দেওয়ার পণ করে নেমেছিলেন হৃদয়। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা দিয়ে মানুষ পাহাড়ও টলিয়ে দিয়েছে যুগে যুগে, অভিজ্ঞতার অভাব সে কোন ছাড়! হৃদয়ের পণেও যেন আজ ছিল সেই আসুরিক শক্তি।

সতীর্থদের আসা যাওয়ার মিছিল দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে ফলো অনে পড়ার শঙ্কাও উঁকি দিচ্ছিল। ১৩৮ রানে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল অর্ধেক ইনিংস। অলআউট হওয়া তো আর ‘মোটে’ ৪টি উইকেটেরই ব্যাপার! 

সে শঙ্কা হৃদয় সামলালেন। তবে ১৮৪ রান তুলতেই যখন সপ্তম উইকেট খুইয়ে বসল বাংলাদেশ, তখন বড় রানের লিড উইন্ডিজের হাতে তুলে দেওয়ার শঙ্কা ঠিকই ছিল মাথার ওপর।

সে সময় সঙ্গী হিসেবে পেলেন তাইজুলকে। সেখান থেকে যা করলেন হৃদয়, তা ‘ওয়ান ম্যান শো’ না হয়েই পারে না। বাংলাদেশ তাদের পরের উইকেটে তুলল ১১৭ রান, সেখানে তাইজুলের অবদান কত জানেন? মাত্র ২২। এই জুটির দুই তৃতীয়াংশ খেলেছেন হৃদয়, রান তুলেছেন একশো’র কাছাকাছি। 

সময়ে সময়ে গিয়ার বদলেছেন। কখনো হাঁকিয়েছেন বিশাল সব ছক্কা, কখনো বা আবার ঢুকে গেছেন খোলসে। দিয়েছেন ব্যাটসম্যানশিপের পরীক্ষাও। না, উইকেট খুব কঠিন ছিল না, কঠিন ছিল পরিস্থিতি। লেজের ব্যাটারদের নিয়ে খেললে স্ট্রাইকটা বেশিরভাগ সময় নিজের কাছে রাখতে হয়, এই বেদবাক্যটা বহু বাংলাদেশি ব্যাটার ভুলে গিয়েছেন বহুবার, তাতে হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে অগুনতি অর্জন। 

হৃদয় সে পথে পা বাড়াননি। কখনো মাইলফলক সামনেও সিঙ্গেলকে না বলেছেন, কখনো আবার শেষ বলে ঝুঁকি নিয়ে হলেও সিঙ্গেল নিয়েছেন, শুধু স্ট্রাইকটা ধরে রাখতে।

পথে কতশত রেকর্ড যে ভাঙলেন! সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে প্রথম ১৫০, এরপর ২০০ করেছেন; নিজের প্রথম সেঞ্চুরিটাকে ডাবলে রূপ দেওয়া প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটারও বনে গেছেন। তামিম ইকবালকে ছাড়িয়ে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ১১টি ছক্কা হাঁকানোর কীর্তি গড়েছেন। এরপর মুশফিকুর রহিমকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ইনিংসটাও খেলে ফেলেছেন। শেষমেশ থেমেছেন ২৪২ রানে। 

না! ভুল বলা হলো। তিনি তো থামেননি। তাকে তো দমানো যায়নি! ইনিংস যখন শেষ হলো, তিনি অপরাজিত ছিলেন ২৪২ রানে। কে জানে, তাসকিন আহমেদ ওভাবে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে উইকেট না হারালে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে ২৫০ রানের মাইলফলকও ছুঁয়ে ফেলতেন কি না!

যেখানে প্রতিপক্ষের বড় লিড নেওয়ার শঙ্কায় ছিল বাংলাদেশ, সেখান থেকে উল্টো নিজেরাই লিড পেল ৩০ রানের। তাওহিদের এই ‘ওয়ান ম্যান শো’ না হলে যে তা হতো না, তা স্কোরকার্ড দেখলেই বুঝা যায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটা যে মোটে ৩৪ রানের!

তিন বছর আগে ফিরে যাওয়া যাক। আফগানিস্তান ম্যাচের আগে সুতোয় ঝুলছিল অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ভাগ্য। ম্যাক্সওয়েলের ওই অবিশ্বাস্য ২০১*, ওই ‘ওয়ান ম্যান শো’ অজিদের তুলে দিয়েছিল নকআউটে। পরে নকআউট তো বটেই, বিশ্বকাপটাও অজিরাই তুলেছিল ঘরে।

বাংলাদেশের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার সমীকরণটাও ঝুলছে সুতোয়। এমন একটা ‘ওয়ান ম্যান শো’ দলকেও উজ্জীবিত করে। এই সঞ্জীবনী সুধায় তবে বাংলাদেশও… 

নাহ এবার বাড়াবাড়িই হয়ে যাচ্ছে!

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor