রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

ভুটানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে যে বিপদ

প্রকাশিত: ০৯:০৬, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ২৮

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত ভুটান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে পরিচিত। পাহাড়, হিমবাহ, নদী আর স্বচ্ছ পানির হ্রদ দেশটির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বড় এক প্রাকৃতিক ঝুঁকি। দেশটির শত শত হিমবাহ হ্রদের মধ্যে ১৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি ভুটানের একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি উপচে বন্যার সৃষ্টি হলে ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়।

বৃহস্পতিবারের ওই ঘটনায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে গাসা জেলার মো ছু নদীর তীরে অবস্থিত জনপ্রিয় প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ গাসা ছাছুর স্থাপনা পানির তোড়ে ভেসে যায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

ভুটানের হ্রদগুলো কেন ঝুঁকিপূর্ণ?

ভুটানের জাতীয় জলবিদ্যা ও আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মোট ৫৬৭টি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে।

এর মধ্যে ১৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে এক সমীক্ষায় এমন হ্রদের সংখ্যা ছিল ২৫। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে আটটি হ্রদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে বিবেচিত হওয়ায় সংখ্যাটি কমিয়ে ১৭ করা হয়।

হিমবাহ গলে পাহাড়ের নিচু জায়গায় পানি জমে এসব হ্রদ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাথর, মাটি ও হিমবাহের পলির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি আটকে থাকে।

ভূমিধস, তুষারধস, অতিবৃষ্টি কিংবা দ্রুত বরফ গলার কারণে এসব বাঁধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর ও মাটি পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসে। এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (জিএলওএফ)। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এ ধরনের বন্যার ভয়াবহতা বোঝাতে ‘আকাশের সুনামি’ শব্দটি ব্যবহার করেছে।

যেসব হ্রদ নিয়ে বেশি উদ্বেগ

ভুটানের লুনানা অঞ্চলের থোরথোরমি ও রাফস্ট্রেং হ্রদ বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দুটি হ্রদের মাঝখানে থাকা পাথর ও পলির প্রাকৃতিক বাঁধের স্থিতিশীলতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ রয়েছে।

২০২৩ সালে জার্নাল অব হাইড্রোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ অঞ্চলের চারটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হ্রদ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। হ্রদগুলো হলো বেচুং ছো, রাফস্ট্রেং ছো, থোরথোরমি ছো ও লুগে ছো।

গবেষকরা সম্ভাব্য বন্যার বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এসব ঘটনায় পানির পরিমাণ ৬ লাখ ঘনমিটার থেকে ৩০ কোটি ঘনমিটার পর্যন্ত হতে পারে। গবেষণার মডেল অনুযায়ী, এতে ১৬ হাজারের বেশি মানুষ এবং হ্রদ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিভিন্ন অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতির হিসাব, বন্যা ঘটার নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

অতীতেও ঘটেছে ভয়াবহ বন্যা

ভুটানে হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯৪ সালের ৬ অক্টোবর লুগে ছো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধের একাংশ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে প্রায় ২১ জনের মৃত্যু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাড়িঘর, কৃষিজমি ও বিভিন্ন অবকাঠামো।

২০২৪ সালে ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০০৯ সালে ছোজো হ্রদ এবং ২০১৫ সালে লেমথাং ছো হ্রদ থেকে বন্যার ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের নথি অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশক থেকে ভুটানে অন্তত ১৮টি হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি পুরনো হ্রদগুলোর আয়তনও বাড়তে পারে। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পাহাড়ের ঢাল ও বরফে জমাট মাটি দুর্বল হয়ে ভূমিধস ও তুষারধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন হলেই হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হবে, এমন নয়। প্রতিটি হ্রদের পানির পরিমাণ, প্রাকৃতিক বাঁধের অবস্থা এবং আশপাশের ভূপ্রকৃতির ওপর এ ঝুঁকি নির্ভর করে।

ঝুঁকি মোকাবেলায় ভুটান স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, মাঠ পর্যায়ের জরিপ এবং নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করছে। তবে কখন কোনো হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা দেখা দিতে পারে, তা আগেভাগে নির্ভুলভাবে জানা এবং নিচু এলাকার মানুষের কাছে যথাসময়ে সতর্কবার্তা পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor