বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিষাক্ত বাতাস যেভাবে অকালেই কেড়ে নিচ্ছে স্মৃতিশক্তি, কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?

প্রকাশিত: ০০:৪৩, ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১১

বায়ুদূষণের খারাপ প্রভাব বলতে সাধারণ মানুষ এতদিন সর্দি-কাশি, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট কিংবা ফুসফুসের সংক্রমণকেই বুঝে আসছিলেন। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতাসে থাকা অতিসূক্ষ্ম ও বিষাক্ত উপাদান কেবল ফুসফুসের ক্ষতি করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং তা সরাসরি আক্রমণ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে। এর ফলে দ্রুত কমতে থাকে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, যা পরবর্তী সময়ে রূপ নেয় ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের মতো জটিল রোগে। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিষাক্ত বাতাস কীভাবে সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়ই বা কী? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

নাসাপথ দিয়ে যেভাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে দূষণ 

আমাদের নাকের ফিল্টারিং ব্যবস্থা বেশ দক্ষ হলেও বাতাসের সব কণা তা আটকাতে পারে না। বিশেষ করে পিএম ২.৫ (PM 2.5)-এর মতো অতিসূক্ষ্ম দূষিত কণা ফুসফুস পেরিয়ে রক্তে তো মিশেই, অনেক সময় নাকের ঘ্রাণ সংক্রান্ত স্নায়ুপথ ধরে সরাসরি মস্তিষ্কে চলে যায়।

চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) বা দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে মাথার ভেতরের প্রতিরক্ষামূলক ‘ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার’ বা রক্ত-মস্তিষ্ক প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে বিষাক্ত পদার্থ সহজেই মস্তিষ্কে ঢুকে নিউরন বা স্নায়ুকোষ ধ্বংস করতে শুরু করে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে পিএম ২.৫ এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের সংস্পর্শে থাকলে মস্তিষ্কে ‘অ্যামাইলয়েড-বিটা প্লাক’ নামের ক্ষতিকর প্রোটিন জমতে শুরু করে, যা আলঝেইমার রোগের মূল কারণ। 

চিকিৎসকরা বলছেন, দূষিত বাতাসে একদিনের শ্বাসেই ডিমেনশিয়া হয় না; বরং এটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি করে রক্তনালী ও ব্রেন টিস্যুকে অকেজো করে দেয়। ল্যানসেট কমিশনও তাই বায়ুদূষণকে ডিমেনশিয়ার অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সচেতন হলে এই বিপদ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। 

কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?

প্রবীণ নাগরিক: যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের সমস্যা রয়েছে, তাদের স্নায়ুতন্ত্র দূষণের কারণে খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

শিশু ও গর্ভস্থ সন্তান: গর্ভাবস্থায় ট্রাফিকের ধোঁয়া বা ক্ষতিকর হাইড্রোকার্বনের সংস্পর্শে এলে শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। এর ফলে শিশুর মনোযোগের অভাব এবং চিন্তাশক্তি ধীরগতির হয়ে যেতে পারে।

ঘ্রাণ ও শ্রবণশক্তি হ্রাস 

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় ঘ্রাণ বা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া স্বাভাবিক হলেও সবসময় তা কেবল বয়সের কারণে হয় না।

অকারণে ঘ্রাণশক্তি লোপ: প্রবীণদের সর্দি-কাশি ছাড়াই হঠাৎ ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়া অনেক সময় স্নায়ুর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। 

শ্রবণশক্তি হ্রাস: কানে কম শুনলে বয়স্ক ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে গুটিয়ে যান, যা পরোক্ষভাবে স্মৃতিভ্রম ও মস্তিষ্কের নিষ্ক্রিয়তাকে বাড়িয়ে তোলে।

বায়ুদূষণ থেকে মস্তিষ্ক সুরক্ষিত রাখার উপায় 

চারপাশের দূষণ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও দৈনন্দিন কিছু ছোট অভ্যাসে মস্তিষ্কের এই মারাত্মক ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়—

AQI দেখে ঘর থেকে বের হোন: শীতকালে বা বাতাসে দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে সকালে ঘরের বাইরে মর্নিং ওয়াকে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। 

সঠিক মাস্ক ব্যবহার করুন: সাধারণ কাপড়ের মাস্ক ফুসফুস বা স্নায়ুর ক্ষতি আটকাতে পারে না। তাই বাইরে বের হলে অবশ্যই এন-৯৫ মাস্ক পরুন। 

ঘরের ভেতরের বাতাস রাখুন পরিষ্কার: শোবার ঘরে ভালো মানের এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন। ঘরের ভেতর ধূপকাঠি জ্বালানো, মশার কয়েল বা ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ রাখুন। 

নাকের নিয়মিত যত্ন: স্যালাইন ওয়াটার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত নাক পরিষ্কার করলে জমে থাকা ধূলিকণা ও ক্ষতিকর উপাদান দূর হয়। 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor