বর্ষা শেষে শরৎ আসে। মাঠে তখন ধানের গন্ধ।
গ্রামের সরু কাঁচা পথ দুদিকে কাশফুল দুলিয়ে দূরে কোথায় মিলিয়ে যায়। বিকেলের শেষে গরুগুলো ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে ঘরে ফেরে। পুকুরের জল ধীরে ধীরে কালো হয়ে ওঠে। বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যা নামে এত আস্তে, যেন কেউ নরম কাপড় বিছিয়ে দিচ্ছে চারদিকে।
একসময় ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে ওঠে। তারপর রাত আরো গভীর হলে মানুষ ভাবে, এবার অন্ধকারের পালা।
কিন্তু গ্রামের পুরনো মানুষরা জানে, রাতেরও কর্মচারী আছে। তাদের নাম জোনাকি।
অনেকেই মনে করে, জোনাকিরা শুধু আলো নিয়ে খেলতে বেরোয়। আসল কথা অনেকে জানে না। গ্রামের জোনাকিরা আসলে রাতের জরুরি বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী। কোথাও অন্ধকার বেশি জমে গেলে, কোথাও ভয় চুপচাপ বসে থাকলে, কিংবা কোনো পথ যদি আলো না পেয়ে মন খারাপ করে, তখনই তারা উড়ে যায়।
এই গোপন খবর জানত শুধু এক ছেলে।
তার নাম মিঠু। সেদিন সন্ধ্যায় দাদির জন্য ওষুধ আনতে গিয়ে মিঠুর ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল। বাজার থেকে ফেরার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। চারদিকে এমন অন্ধকার, যেন কেউ বিশাল এক কালো চাদর মেলে দিয়েছে। মিঠু দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই তার সামনে একটা জোনাকি এসে তিনবার টুপ... টুপ... টুপ করে জ্বলে উঠল। তারপর বলল, এই যে, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
মিঠু চারদিকে তাকাল। কেউ নেই। জোনাকিটা আবার বলল, এদিকে তাকাও। নিচে।
মিঠু হাঁটু গেড়ে বসতেই দেখল, জোনাকিটা সাধারণ জোনাকি নয়। কোমরে ছোট্ট একটা বেল্ট। পিঠে খুদে ব্যাগ। মাথায় হলুদ রঙের টুপি।
তুমি... কথা বলো?
ডিউটির সময় বলতেই হয়।
তুমি কে?
জোনাকিটা বুক ফুলিয়ে বলল, আমি ঝিকু। জোনাকি বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী লাইনম্যান।
মিঠুর চোখ গোল।
তোমাদের আবার বিভাগ আছে?
না থাকলে রাত চলে? এত অন্ধকার কে সামলায়?
মিঠু কিছু বলার আগেই আকাশের দিক থেকে হালকা ‘টিং’ শব্দ এলো।
ঝিকু ব্যাগ থেকে একটা পাতা বের করল।
ওহো! জরুরি খবর এসেছে। পশ্চিম পাড়ার তালগাছের নিচে অন্ধকার জমে গেছে। সবাই চলো!
কোথা থেকে যেন আরো বিশ-পঁচিশটা জোনাকি এসে হাজির। কেউ বলল, মই এনেছ?
আরেকজন বলল, অত আলো দিয়ো না। পেঁচা সাহেব অভিযোগ করেন।
একজন মোটা জোনাকি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, আগে হাজিরা খাতা সই করি। নিয়ম না মানলে অফিসে বকুনি খাব।
মিঠু অবাক হয়ে তাদের পেছন পেছন গেল। তালগাছের নিচে গিয়ে সে দেখল, জায়গাটা সত্যিই অদ্ভুত অন্ধকার। যেন রাত এসে ওইখানেই গুটিসুটি মেরে বসে আছে। ঝিকু বলল, সবাই কাজে লেগে পড়ো! মুহূর্তেই জোনাকিরা গোল হয়ে উড়তে লাগল। কেউ ওপরে, কেউ নিচে, কেউ ডালে, কেউ ঘাসের কাছে। দেখতে দেখতে পাতলা হয়ে এলো অন্ধকার। তারপর একসময় জায়গাটা নরম আলোয় ভরে গেল। মিঠু হাততালি দিয়ে উঠল।
ঝিকু গম্ভীর গলায় বলল, হাততালি পরে দিয়ো। এখনো তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাজ বাকি। তার পর থেকে প্রায় প্রতি রাতেই মিঠুর সঙ্গে ঝিকুর দেখা হতে লাগল। একদিন তারা খালের ধারে যায়। সেখানে দেখা গেল একটা ব্যাঙ মুখ গোমড়া করে বসে আছে।
ঝিকু বলল, কী হয়েছে?
ব্যাঙ বলল, এত অন্ধকারে মশা দেখা যাচ্ছে না।
পাঁচটা জোনাকি উড়ে গিয়ে পানির ওপর এমন সুন্দর আলো করল যে ব্যাঙ খুশি হয়ে বলল, আহা! এবার তো রাতের খাবার দেখা যাচ্ছে!
আরেক দিন গ্রামের এক বৃদ্ধা দাদি উঠানে রাখা চশমা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। দশ-বারোটা জোনাকি চুপচাপ গিয়ে চশমার চারপাশে গোল হয়ে জ্বলে উঠল। দাদি বললেন, আল্লাহ, কে যে আলো দেখাল!
জোনাকিরা খিলখিল করে হাসল।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ এলো পূর্ণিমার পরের সপ্তাহে। সেদিন সন্ধ্যা থেকে একটা জোনাকিও দেখা যাচ্ছে না। গ্রাম যেন কেমন অচেনা হয়ে গেছে। মিঠু দৌড়ে বাঁশবাগানে গিয়ে দেখল, সবাই একসঙ্গে বসে আছে। কারো আলো জ্বলছে না। ঝিকু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বড় বিপদ।
কী হয়েছে?
আমাদের আলো রাখার গাছটার আলো ফুরিয়ে গেছে।
আলো রাখার গাছ?
হ্যাঁ। দিনের বেলা আমরা আলো জমা রাখি শিশিরপাতার ভেতর। আজ সব খালি।
মিঠু অনেকক্ষণ ভেবে বলল, তা হলে গ্রামের সবাইকে ডাকা যাক।
সেদিন রাতে গ্রামের মানুষ প্রথমবার এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। বাড়ির বারান্দায়, উঠানে, পুকুরঘাটে, মাঠের ধারে সবাই ছোট ছোট প্রদীপ জ্বালাল। কেউ টর্চ ধরল, কেউ লণ্ঠন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল নরম আলো।
ঝিকু খুশিতে বলল, এই তো! মানুষ একটু আলো দিলে আমরা বাকিটা সামলে নিতে পারি।
অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। জোনাকিদের নিভে যাওয়া শরীরগুলো আবার একে একে জ্বলে উঠতে লাগল। একটা... দুটো... তারপর শত শত। সারা গ্রাম যেন আকাশের তারাগুলো মাটিতে নেমে এসেছে। পরদিন সকালে কিছুই আর বোঝার উপায় রইল না। জোনাকিরা আবার সাধারণ জোনাকির মতোই উড়ে বেড়ায়। কেউ তাদের স্যালুট করে না। কেউ হাজিরা খাতা দেখে না।
মা বললেন, কাল রাতে কত জোনাকি ছিল, তাই না?
মিঠু শুধু হেসে বলল, ওরা ডিউটিতে ছিল।
মা ভেবেছিলেন, ছেলে হয়তো ঠাট্টা করছে। মিঠু আর কিছু বলল না। কারণ সরকারি দপ্তরের গোপন খবর সবাইকে বলতে নেই। তবে আজও গ্রামের কোনো পথে যদি হঠাৎ অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি জোনাকি দেখা যায়, তাহলে বুঝে নিয়ো কোথাও অন্ধকার বেড়েছে। জোনাকি বিদ্যুৎ বিভাগের রাতের শিফট শুরু হয়ে গেছে।
Publisher & Editor