শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

ফ্যাটি লিভার থেকে ক্যান্সার, শরীরে যে ৭ লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন

প্রকাশিত: ১৩:৩৭, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪

সারা দিন বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস- আধুনিক জীবনের এসব অভ্যাসের সঙ্গে বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি। সমস্যা হলো লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেও প্রথম দিকে অনেকেই তা টের পান না।

শরীরে তেমন কোনো উপসর্গ না থাকায় বছরের পর বছর অজান্তেই চলতে পারে এই সমস্যা। কিন্তু ফ্যাটি লিভার কি একসময় লিভার ক্যান্সারের কারণ হতে পারে? কোন পর্যায়ে এই রোগ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে? হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন দেরাদুনের কৈলাশ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট চিকিৎসক শাশ্বত তিওয়ারি। তার মতে, ফ্যাটি লিভার হলেই ক্যান্সার হবে, এমন নয়। তবে লিভারে প্রদাহ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি হচ্ছে কি না, তা বোঝা জরুরি।

ফ্যাটি লিভার কিভাবে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়

লিভারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এই সমস্যায় অনেকেরই কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে লিভারে জমে থাকা চর্বি থেকে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় স্টিয়াটোহেপাটাইটিস।

প্রদাহ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে লিভারের টিস্যুতে ক্ষত বা দাগ তৈরি হতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় ফাইব্রোসিস। ক্ষতি আরও বাড়লে তা সিরোসিসে রূপ নিতে পারে। আর সিরোসিস হলে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। চিকিৎসক শাশ্বত তিওয়ারির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফ্যাটি লিভার থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগটি কতটা এগিয়েছে এবং লিভারে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে কি না।

তবে মনে রাখতে হবে, ফ্যাটি লিভার থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির লিভারে গুরুতর ক্ষতি হয় না। আবার সিরোসিস না থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে লিভার ক্যান্সার হতে পারে।

যেসব ৭ লক্ষণ অবহেলা করবেন না

ফ্যাটি লিভার কিংবা লিভার ক্যান্সার দুটিরই প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। রোগের অগ্রগতির সঙ্গে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যান্সার হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। তবে এগুলো স্থায়ী হলে বা অস্বাভাবিক মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।

১. ওজন কমে যাওয়া

খাদ্যাভ্যাস বা শরীরচর্চায় কোনো পরিবর্তন না এনেও যদি অল্প সময়ে ওজন কমতে থাকে, বিষয়টি অবহেলা করবেন না। অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস লিভারের সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন রোগের লক্ষণ হতে পারে।

২. খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া

আগের মতো খেতে ইচ্ছা না করা, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি কিংবা দীর্ঘদিন ক্ষুধামন্দা থাকলে কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে এর সঙ্গে ওজন কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৩. দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা

পেটের ব্যথা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বা বারবার ফিরে এলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়। ব্যথার কারণ লিভারের সমস্যা ছাড়াও অন্য কোনো শারীরিক অসুস্থতা হতে পারে। তাই নিজে থেকে রোগ নির্ধারণ না করে পরীক্ষা করানো জরুরি।

৪. পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে অস্বস্তি

লিভার পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে অবস্থিত। ওই স্থানে বারবার ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি অনুভূত হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। তবে এই ধরনের ব্যথা মানেই লিভার ক্যান্সার নয়।

৫. পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া

পেটের আকার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা পেটে তরল জমার কারণে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। উন্নত পর্যায়ের লিভার রোগে এমনটা হতে পারে। হঠাৎ পেট ফুলে গেলে, বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট সঙ্গে থাকলে, দ্রুত চিকিৎসা নিন।

৬. চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া

চোখের সাদা অংশ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেলে তাকে জন্ডিস বলা হয়। লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া ছাড়াও পিত্তনালির সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে জন্ডিস হতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

৭. অস্বাভাবিক ক্লান্তি

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, শরীরে শক্তি না পান বা দৈনন্দিন কাজে আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্য না থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন। ক্লান্তির অনেক কারণ থাকতে পারে; দীর্ঘস্থায়ী হলে পরীক্ষা করে কারণ জানা দরকার।

ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে কী করবেন

ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হওয়ার পর আতঙ্কিত না হয়ে রোগের পর্যায় বুঝে ব্যবস্থা নেয়াই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভারের অবস্থা, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম বা লিভারে ক্ষত কতটা হয়েছে তা বোঝার পরীক্ষা করা হয়।

ঝুঁকি কমাতে কিছু অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন : অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা করুন।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন : হাঁটা ও অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন : অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয় ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার কমিয়ে সুষম খাবার খান।
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন : এসব সমস্যার সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে।
নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না : লিভার ভালো করার নামে বিভিন্ন ওষুধ বা ভেষজ উপাদান ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ফ্যাটি লিভার এখন পরিচিত একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। কিন্তু পরিচিত বলেই একে অবহেলা করা উচিত নয়। আবার ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লেই লিভার ক্যান্সার হবেএমন ধারণাও ঠিক নয়। মূল বিষয় হলো, লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি প্রদাহ বা ক্ষত তৈরি হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকা।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor