ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরা একটি স্যুটের ট্যাগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। গত ৫ অক্টোবর নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে এক সমাবেশে অংশ নেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ব্র্যান্ড জোস. এ. ব্যাংকের নেভি ব্লু রঙের স্যুট পরেছিলেন তিনি। সমাবেশে স্যুটের জ্যাকেট খুলে ফেললে এর ট্যাগ দৃশ্যমান হয়। এরপরই প্রশ্ন ওঠে, ট্রাম্পের পরা স্যুটটি কি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি, নাকি বাংলাদেশসহ অন্য কোনও দেশ থেকে আমদানি করা?
ঘটনাটি নিয়ে টেক্সটাইল টাইমস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছে। বিষয়টি ট্রাম্পের পোশাকের পছন্দ নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে পুরুষদের পোশাক সরবরাহে বাংলাদেশের ভূমিকার বিষয়টিও সামনে এনেছে। খবর সিএনএন-এর।
যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানো, দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো—ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অন্যতম লক্ষ্য। সে ক্ষেত্রে বিদেশে তৈরি পোশাক পরার সম্ভাবনা তার রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
স্যুটের দাম কত, কোথায় তৈরি?
ট্রাম্পের স্যুটের ট্যাগটি জোস. এ. ব্যাংকের ‘ট্রাভেলার’ সংগ্রহের একটি স্যুটের ট্যাগের সঙ্গে কিছুটা মিলে যায়। ব্র্যান্ডটির বড় গড়নের পুরুষদের জন্য তৈরি কালো রঙের একটি স্যুট বর্তমানে ছাড়ে ২৭৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। পণ্যের বিবরণে বলা হয়েছে, স্যুটটি সহজে কুঁচকে যায় না এবং দাগ প্রতিরোধী। ফলে দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য এটি ব্যবহার উপযোগী।
তবে ট্যাগের সাদৃশ্য থেকে ট্রাম্পের পরা স্যুটটির নির্দিষ্ট মডেল কিংবা দাম নিশ্চিত করা যায়নি। একইভাবে, পোশাকটি কোথায় তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
জোস. এ. ব্যাংক বৃহত্তর পোশাক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টেইলর্ড ব্র্যান্ডসের অংশ। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় রয়েছে ‘মেনস ওয়্যারহাউস’ ব্র্যান্ডও। তাদের কিছু পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়। যেমন, ‘জোসেফ অ্যাবাউড’ ব্র্যান্ডের কিছু পোশাকের দাম প্রায় ৭০০ ডলার। এ ছাড়া জোস. এ. ব্যাংকের ‘আমেরিকান বেসপোক’ নামে একটি সংগ্রহ রয়েছে, যেটিকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বলে প্রচার করা হয়।
কিন্তু ওই সংগ্রহের পোশাকের ট্যাগের সঙ্গে ট্রাম্পের স্যুটে দেখা ট্যাগের মিল নেই। ফলে তার পরা স্যুটটি চীন কিংবা বাংলাদেশে তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এর উৎপাদনস্থল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্যুটটি বিদেশে তৈরি হয়ে থাকলে তা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে একটি বৈপরীত্য তৈরি করতে পারে। তবে একটি বিদেশি পোশাক পরার ঘটনা দিয়ে তার প্রশাসনের উৎপাদননীতি ব্যর্থ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির চেষ্টা?
ট্রাম্পের পোশাক নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। এর আগে তার অতিরিক্ত লম্বা টাই নিয়ে নানা সময়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হয়েছে। গত মাসে ওয়াশিংটনের মৃদু আবহাওয়ায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে স্বাগত জানানোর সময় ওভারকোট ও গ্লাভস পরা নিয়েও সমালোচকেরা কটাক্ষ করেন। এবার স্যুটের ট্যাগ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনীতিতে পোশাক নিয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা প্রায়ই দেখা যায়। তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সঙ্গে বিষয়টি বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। একজন ধনকুবের হিসেবে তার পরিচিতি, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং সম্পদের প্রদর্শন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার অংশ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষের কাছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী পোশাক পরার বিষয়টি ভিন্ন বার্তা দিতে পারে। কেউ কেউ এটিকে মধ্যবিত্তের জীবনযাপনের কাছাকাছি থাকার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখতে পারেন।
তবে ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির জন্য এমন স্যুট বেছে নিয়েছেন, এমন কোনও প্রমাণ নেই।
ট্যাগটি কি ইচ্ছাকৃতভাবে দেখানো হয়েছিল?
ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য ঘিরে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসে। এ ক্ষেত্রেও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার ভাবমূর্তি তৈরির জন্য স্যুটের ট্যাগটি কি পরিকল্পিতভাবে দেখানো হয়েছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পোশাকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির নজির রয়েছে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের সোয়েটার, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সামরিক পোশাকের মতো দেখতে শিকারের জ্যাকেট এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের কাউবয় বুট একসময় আলোচনায় এসেছিল।
তবে ট্রাম্পের স্যুটের ট্যাগ দেখানোও পরিকল্পিত ছিল, এমনটা বলার মতো কোনও স্পষ্ট প্রমাণ নেই। ভিডিওতে দেখা যায়, মঞ্চে নাচার সময় স্যুটের সামনের অংশ খুললে ট্যাগটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ফলে ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃতভাবেও ঘটতে পারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য ‘ফ্লোরশেইম’ ব্র্যান্ডের জুতা কিনেছিলেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়। তুলনামূলক সাশ্রয়ী এই জুতার প্রশংসা করে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্নিকার্সের পরিবর্তে সেগুলো পরার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এসব ঘটনা থেকে কেউ কেউ মনে করছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের পোশাক বাছাইয়ের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর পেছনে কোনও রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই।
পোশাকের প্রচারে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য?
ট্রাম্প অতীতেও নিজের পরিচিতি ও রাজনৈতিক ভাবমূমর্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেছেন। জর্জিয়ার একটি মামলায় গ্রেফতারের পর তোলা তার মাগশট ছবির সময় পরা স্যুটের কাপড়ের নমুনাও বিক্রি করা হয়েছিল। এ ছাড়া বাইবেল, ঘড়ি, স্টেক, ওয়াইন ও পানির মতো পণ্যও তার ব্যবসায়িক উদ্যোগের অংশ হয়েছে।
এ কারণে জোস. এ. ব্যাংকের স্যুটের ট্যাগ দৃশ্যমান হওয়ার পেছনে কোনও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচিতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে লাল রঙের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ টুপি। তার জনপ্রিয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক এই টুপির দাম অনলাইন স্টোরে ৫৫ ডলার। পণ্যটির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের স্যুটের ট্যাগ নিয়ে আলোচনা চললেও পোশাকটি বাংলাদেশে তৈরি কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এটি তার পোশাকের পছন্দে পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নিছক অনিচ্ছাকৃত ঘটনা, নাকি নতুন কোনও বিতর্কের উপলক্ষ—তা স্পষ্ট হতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
Publisher & Editor