ছোটনের স্কুলে আজ বনভোজনের আয়োজন হবে। তাই আজকে নিজে থেকে খুব সকালে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল সে।
অন্য দিন মায়ের খুব ধকল যায় ওকে ঘুম থেকে তুলে স্কুলের জন্য সময়মতো রেডি করতে। আজকে ঠিক তার উল্টো। সঞ্জু, পিন্টু রাইয়ান, তমাল, তরু, অন্তু আর ছোটন; সবাই জলদি পৌঁছে যাবে স্কুলে এমনটাই গতকাল প্ল্যান করেছিল ওরা। তাই এত তাড়া।
বাবার সঙ্গে স্কুলে সময়মতো পৌঁছে গেল ছোটন। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি আসে যখন-তখন, তাই বাবা ওকে একটি লাল রঙের ছোট্ট ছাতা কিনে দিয়েছেন। ছাতাটা ওর হাতে দিয়ে বাবা চললেন বাড়ির দিকে। সব বন্ধুরা ‘ছোটন’ বলে ডাক দিতেই ছুটে গেল স্কুলের মাঠের একটি কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বড় আমগাছটার তলায়।
ওখানেই আজ বনভোজনের আয়োজন করবে তারা। ছুটির পর আজ একটু দেরিতে বাড়ি যাবে—সেকথা সবার বাড়িতে জানানো আছে আগেভাগেই।
ছোটনদের ক্লাস টু-এর ছুটির ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ওর বন্ধুরা সব আমগাছটার তলায় এসে জড়ো হলো। ছোটন আর পিন্টু হলো মূল পরিকল্পনাকারী। ঠিক হলো তমাল আর তরু জোগাড় করবে শুকনা ডালপালা; রাইয়ান ও সঞ্জুরা গেল কিছু ইটের কুচি জোগাড় করতে, মাংস রান্নার জন্য।
বাজারের দায়িত্ব ছিল অন্তু আর তমালের কাঁধে। কিছু সবুজ কচি পাতা, জংলা ফুল আর ডুমুরের ছোট ছোট ফল খুঁজে আনল তারা, যা দিয়ে সবজি রান্না করা হবে। পিন্টু এনেছিল ওর বড় বোনের খেলনা হাঁড়ি-পাতিলগুলো। সব প্রস্তুতি শেষ, ঠিক তখনই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। আকাশে কালো বড় মেঘ কোত্থেকে কখন যে এসে জড়ো হলো তা কে জানে! সবাই দৌড়ে স্কুলের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নিলেও ছোটন দ্রুত ওর ছোট্ট ছাতাটা মেলে ওখানেই বসে পড়ল। আপ্রাণ চেষ্টা করল বনভোজন খেলার সরঞ্জামগুলো যেন একটুও না ভেজে। মুষলধারে বৃষ্টি আর বজ্রপাতের ভয়ার্ত গর্জন শুনে আচমকা চোখজোড়া বন্ধ করল সে। হঠাৎ... কে যেন তার কাঁধে চড়ে বসল! ফিসফিস করে ওর কানে বলল, “ইস্! দিলে তো মজাটা নষ্ট করে!” ছোটনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। “এত চেষ্টা করি, তবু পরীক্ষায় ফেল।” এ কথা বলে টুপ করে গড়িয়ে ছাতাটার সামনের শিক ধরে ঝুলে পড়ল এক ফোঁটা বৃষ্টির জল! “সে কথা বলছে! সুতার মতো হাত-পা আছে দেখছি!” ছোটন মনে মনে ভাবে। মন খারাপ করে বৃষ্টির ফোঁটাটা ছোটনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ আমাদের মেঘ পাঠশালায় পরীক্ষা চলছে। আজকের বিষয়—এই গ্রামে মুষলধারে বৃষ্টি নামাতে হবে। সবখানে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে হবে। আমার দায়িত্বে তোমাদের এই স্কুল মাঠ পড়েছে। কিন্তু তুমি ছাতা মেলে বসায় আমি শুধু এই জায়গায় বৃষ্টি নামাতে পারছি না। এমন হলে আমি তো ফেল করব!” ছোটনের বিশ্বাস হয় না সে একটা পানির ফোঁটার সঙ্গে কথা বলছে! মুখ ফসকে বলে ফেলল, “তু তু তুমি কি ভূত?” বৃষ্টির ফোঁটা তখন এক হাতে ঝুলে হাসি মুখে বলল, “আমি ফোটন। মেঘ পাঠশালায় প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। তুমি?” ছোটনও বলল, “আমি ছোটন, দ্বিতীয় শ্রেণি।” একটু স্বাভাবিক হয়ে ছোটন বলল, “আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে এই আমগাছতলায় বনভোজন খেলা করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নামায় মজাটাই মাটি হয়ে গেল। এই, তোমাদের পরীক্ষা কখন শেষ হবে?” ফোটন জবাব দিল, “আজ তো আমাদের এক ঘণ্টার পরীক্ষা। আমাদের বড় ক্লাসের বৃষ্টিদের পরীক্ষা তো ২, ৩, ৪, ৫ ঘণ্টাও চলে! চতুর্থ শ্রেণির পরীক্ষাটা খুব কঠিন। বিষয়—বন্যা তৈরি করা। পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা তো আরো কঠিন! বিষয়—অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধস। আমি তো প্রথম শ্রেণিতেই ফেল করব।” ছোটন এবার সব কথা শুনে বুঝতে পারল। তারপর বলল, “একটু নম্বর কম পেলে কী এমন হয় ফোটন! তুমি আমাদের স্কুল মাঠ আর গ্রাম যথেষ্ট ভিজিয়েছ। শুধু এই বনভোজনের জায়গাটা ছেড়ে দাও না।” ফোটনও একটু ভাবল। তারপর সে রাজি হলো।
বৃষ্টি একটু কমতে শুরু করল। বন্ধুরা দৌড়ে ওই জায়গায় ফিরে এলো। তখন কোন ফাঁকে যে টুপ করে দুষ্ট ফোটনটা ছোটনের ছাতার মধ্যে লুকিয়ে পড়ল, কেউ জানতে পারল না।
সবাই বনভোজন খেলা শেষে একে একে বিদায় নিল। ছোটন বাবার সঙ্গে হাঁটতে লাগল প্রিয় ছাতাটা মেলে। টিপ টিপ বৃষ্টি তখনো পড়ছে। ছোটন আনমনে ভাবছে, আসলেই কি ফোটন এসেছিল? কথা বলেছিল ওর সঙ্গে? নাকি ছাতা মেলে যখন সে বসে পড়েছিল আমগাছতলায়, তখন চোখ বুঝে ঘুমিয়ে পড়েছিল কি? “ধুর! বৃষ্টির আবার পরীক্ষা হয় নাকি!?” এ কথা ভাবা মাত্রই টুপ করে বড় একটা জলের ফোঁটা ওর ছাতার ওপর পড়ল। গড়িয়ে পড়ে ছাতার শিক ধরে ঝুলতে ঝুলতে বলল, “হয় বন্ধু, হয়!” ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছোটন পেছন ফিরে দেখে, ফোটন একগাল হাসি দিয়ে ঝুলে আছে। ফিক করে হেসে সে বলল, “এবার আমগাছতলাটা ভিজিয়ে দিয়ে এসেছি। এবার মেঘ পাঠশালা ১০০-তে ১০০ নম্বর আমাকে না দিয়ে পারবেই না! হি হি....।”
Publisher & Editor