শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের ১৮ বছর পূর্তি উদযাপন: ‘রাজনৈতিক তোষামোদী মিডিয়া গ্রহণযোগ্যতা হারায়’

প্রকাশিত: ০৭:০৭, ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩

আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের ১৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিউইয়র্কে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ‘বিশ্বব্যাপী মিডিয়া অস্তিত্ব সংকটে’ শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রভাব, সাংবাদিকতার পেশাগত মান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব এবং প্রবাসী বাংলা গণমাধ্যমের নানা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্টরা।

২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার উডসাইডের গুলশান ট্যারেস মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গণমাধ্যমের মূল শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। রাজনৈতিক তোষামোদ, তথ্য গোপন বা অসত্য সংবাদ পরিবেশন করলে গণমাধ্যম ধীরে ধীরে পাঠক ও দর্শকের আস্থা হারায়। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের এই সময়ে বস্তুনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি শওকত ওসমান রচি। সঞ্চালনা করেন ক্লাবের সাবেক সভাপতি দর্পণ কবীর। অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তূজা, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক এবং প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমদ।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন প্রবীণ সাংবাদিক সাঈদ তারেক ও মঈনুদ্দীন নাসের, বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক রতন তালুকদার, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী, প্রবাস পত্রিকার সম্পাদক ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ সাঈদ এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক শোয়েব আহমেদ ভূঁইয়া।

সেমিনারে মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর ‘কেমন আছে বাংলাদেশি মিডিয়া’ শীর্ষক লেখা পাঠ করেন দর্পণ কবীর। এর ওপর আলোচনায় প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমদ বলেন, গণমাধ্যমে অপপ্রচার, মিথ্যা সংবাদ বা সত্য আড়াল করার চেষ্টা হলে মানুষ বিকল্প মাধ্যমের দিকে ঝুঁকবে। এতে মূলধারার গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা কমতে পারে। সাংবাদিকদের সংবাদ লেখা ও পড়ার চর্চা বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তূজা বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সংকটের পেছনে মালিক ও সম্পাদকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক তোষামোদ গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, নিউইয়র্কে কর্মরত বাংলা গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।

কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, মানুষ সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানতে চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গণমাধ্যমকে নতুন বাস্তবতা ও প্রতিযোগিতা মেনে নিতে হবে। ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে তা স্বীকার করে সংশোধন করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাঈদ তারেক বলেন, সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার চরিত্র ও সংজ্ঞা বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের পাশাপাশি অনেক গণমাধ্যমে সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা ও কর্মপরিবেশ নিয়েও সংকট রয়েছে। ডা. ওয়াজেদ এ খান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআইয়ের উত্থান প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অসত্য তথ্যের বিপরীতে যাচাই করা তথ্য তুলে ধরা মূলধারার গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

মঈনুদ্দীন নাসের সাংবাদিকতায় সততার গুরুত্ব তুলে ধরেন। শোয়েব আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, সাংবাদিকতায় চাটুকারিতা থাকলে সৎ সাংবাদিকতার চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। মোহাম্মদ সাঈদ প্রবাসী বাংলা গণমাধ্যমের পাঠক কমে যাওয়া ও প্রকাশনা সংকটের কথা তুলে ধরেন। ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমের সংকটকে শুধু এআই বা প্রযুক্তির ওপর চাপালে মূল সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে; প্রযুক্তি, পাঠকের অভ্যাস ও গণমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল—সবই পরিবর্তিত হয়েছে। রতন তালুকদার বলেন, গণমাধ্যমে সমস্যা অতীতেও ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে; তবে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ ঠেকাতে সতর্ক থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মজুমদার। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কোষাধ্যক্ষ মল্লিকা খান মুনা, সহসভাপতি মোহাম্মদ মনজুরুল হক ও সহসাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক। প্রেসক্লাবের ১৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা ‘আলোকবর্তিকা’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়। স্মরণিকার সম্পাদক তোফাজ্জল লিটন বক্তব্য দেন।

সেমিনার শেষে কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। পরে কণ্ঠশিল্পী এম. এ. সোয়েব ও অভিনেত্রী মৌসুমীকে বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়। বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় এম. এ. সোয়েবের হাতে এবং প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তূজা ও কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৌসুমীর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন এম. এ. সোয়েব ও টিনা রাসেল। অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কের কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এবং প্রেসক্লাবের সদস্যরা সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor