মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভূতেরা এখন চাকরি খুঁজছে

তৌসিফ হাসনাত আনান

প্রকাশিত: ০৯:১৯, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫

এখন নিস্তব্ধ রাত! রাত যতই গভীর হচ্ছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আরো বাড়ছে। চারদিকে মৃদু বাতাস বইছে।

গাছের পাতা নড়ছে, তবে শব্দ হচ্ছে না! মনে হচ্ছে কেউ যেন শব্দকে চেপে ধরে রেখেছে। নাকি সুরে শোনা যাচ্ছে অস্পষ্ট শব্দ ‘ফিরে যা, ফিরে যা।’
একসময় এই শব্দ শুনলে মানুষ ভয়ে থরথর করে কাঁপত। ভয়ে রোজ সন্ধ্যার পর জানালা বন্ধ করে দিত।

বাচ্চারা মায়ের আঁচলে লুকিয়ে থাকত। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। কারণ এখন সবার চোখ ফোনের স্ক্রিনে। কেউ আর ভূতকে ভয় পাচ্ছেই না।

এ জন্য শতবর্ষী বটগাছের নিচে আজ ভূতেদের এক সভা বসেছে। গাছের নিচে বসে আছে ভূত-পেত্নীর দল। হঠাৎ করে জোরে খুঁক খুঁক কাশির শব্দ হলো। তারপর কর্কশ গলায় ভেসে এলো,
—‘আমাদের সময়টা বড্ড খারাপ যাচ্ছে, বুঝলি?’

এই গলা মাস্টার ভূতের। এই মাস্টার ভূতই হলো বর্তমানে ভূতজগতের সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দা।

ভূতসমাজে প্রচলিত আছে যে মানুষরা যখন থেকে ভূতদের ভয় পেত সে নাকি ওই সময়কার ভূত।
মাস্টার ভূত বলতে শুরু করল, ‘একসময় মানুষ আমাদের নাম শুনলেই কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিত। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, আর এখন মানুষ আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়!’

তার বক্তব্যের মধ্যে আরেক ভূত বলে উঠল, ‘গত কয়েক বছরে ভূত দেখে ভয় পাওয়া মানুষের পরিসংখ্যান প্রায় শূন্য!’

ভূতেরা এক অন্যের দিকে তাকিয়ে বলাবলি করতে লাগল, তাই বলে একেবারে শূন্য?

আবার মাস্টার ভূত সবাইকে চুপ করিয়ে বলতে লাগল, ‘অবাক হওয়ার কিছুই দেখছি না! আমাদের ভূতদের এখন বেকারত্ব চলছে! আমরা কাউকে ভয়ই দেখাতে পারছি না। এমন করে চললে আমাদের নতুন চাকরি খুঁজতে হবে।’

মাস্টার ভূতের কথার সঙ্গে সম্মতি দিয়ে আরেক ভূত বলে উঠল, ‘ঠিকই বলেছ। গতকাল এক বাড়িতে গিয়ে এক বাচ্চাকে ভয় দেখাতে দাঁত খিটখিটিয়ে বীভৎস হাসি হাসলাম। উল্টো সে ভয় না পেয়ে বলে উঠল, আমার হাসির শব্দ নাকি সাউন্ডবক্সের চেয়েও বাজে! ভাবা যায়?’

আরেক ভূত বলল, ‘এখনকার বাচ্চারা তো ভুতের রিলস দেখে, তাহলে ভয় কেনই বা পাবে? তাদের কাছে আমরা এখন হাসির পাত্র হয়ে গেছি।’

সব ভূতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা শুনে আরেক বয়স্ক ভূত পরামর্শ চাইল যে কিভাবে মানুষকে ভূতে ভয় পাওয়ানো যাবে?

জোয়ান এক ভূত বলে উঠল, ‘মানুষরা এখন ফোনে আসক্ত। ভয় যদি দেখাতেই হয় তবে ফোনের ভেতর ঢুকেই ভয় দেখাতে হবে।’ তাই সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ‘আগামী এক সপ্তাহ সবাই ফোনের ভেতরে ঢুকে মানুষদের ভয় দেখাবে।’ এভাবে তাদের প্রস্তুতিমূলক ভয় দেখানোর পরীক্ষা শুরু হলো।

পরের দিন এক পেত্নী একটি বাড়িতে ঢুকে দেখল একটা মেয়ে টিকটকে রিলস বানাচ্ছে। সে সোজা ফোনের ভেতর ঢুকে ভয়ংকর চেহারা নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে হাজির হলো, আর হাউ মাউ খাউ বলতে লাগল। কিন্তু সেই মেয়েটি পেত্নীকে ভয় পাওয়ার বদলে টিকটক রিলসের ‘ফ্লিটার’ ভেবে হাসতে লাগল!

ওদিকে আরেক ভূত এক বাড়িতে ঢুকে মানুষের কানে কাছে হুউউউ বলে শব্দ করতে লাগল। ঘরে কেউ না থাকা সত্ত্বেও লোকটি ভয় পাওয়ার বদলে ভাবল, রুমের এসি মনে হয় কুলিং মুডে চলে গেছে, এই বলে সে এসি বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল।

এভাবে একে সব ভূত ব্যর্থ হলো। কোনোক্রমেই তারা মানুষদের ভয় দেখাতে পারল না। এক সপ্তাহ পর নির্জন রাতে তারা আবার সভায় এলো। এবার সবাই হতাশ! এমন করে চললে তো তাদের সত্যিই অন্য পেশা বেছে নিতে হয়।

সবাই এবার বয়োজ্যেষ্ঠ মাস্টার ভূতের শরণাপন্ন হয়ে কোনো বুদ্ধি বের করার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। অনেক ভেবে মাস্টার ভূত বলল, ‘যখন আমি জোয়ান ছিলাম তখন মানুষকে ভয় না দেখালেও তারা ভূতদের নাম শুনলে কাঁপত, কারণ তখন সন্ধ্যার পর বাড়ি বাড়ি ভূতের গল্পের আসর বসত। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ—সবাই সেই আসরে থাকত। তাই যদি তাদের মনে ভয় জাগাতে হয়, তাহলে তাদের ভূতের গল্প শোনাতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ওই রাতেই তারা সেই বাচ্চাদের বাড়ি গেল যারা ভূতে ভয় করে না। তারা তাদের স্বপ্নে গিয়ে পুরনো সেই গা ছমছমে ভৌতিক গল্প শোনাল। স্বপ্ন শেষে তারা ভয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। পরের দিন ওই বাচ্চারা তাদের নানা-নানির কাছে গিয়ে আরো ভূতের গল্প শোনার আগ্রহ প্রকাশ করল। গল্প শুনতে তাদের বেশ ভয় লাগলেও টানটান উত্তেজনা কাজ করত তাদের মধ্যে। এভাবে সবাই একসময় ভূতে ভয় পেতে শুরু করল।

পরবর্তী সভায় ভূতরা খুব খুশি। বাচ্চারা ভয় না পেলে তো তাদের অন্য চাকরি খুঁজতে হতো। এখন রোজ সন্ধ্যার পর বাচ্চারা বলে, ‘আরো একটা ভূতের গল্প শোনাও।’

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor