শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরানের গহীন ভিতর সৈয়দ শামসুল হক

প্রকাশিত: ০৮:০১, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৯

‘সব্যসাচী’ অভিধায় পরিচিত লেখক সৈয়দ শামসুল হক। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কাব্যনাট্য, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, অনুবাদ, শিশুসাহিত্য—শিল্প-সাহিত্যের বিচিত্র শাখায় নিজের সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে গেছেন।

গান রচনা করেছেন। অনেক চলচ্চিত্রের কাহিনিও লিখেছেন। লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বরণ করেছিলেন। মৃত্যুশয্যায়ও লিখে গেছেন।

তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আজকের লেখা।
সৈয়দ শামসুল হকের বহুল পরিচিত কাব্য ‘পরানের গহীন ভিতর’। এখানে ৩৩টি কবিতা আছে। নাম কবিতাটি ৩৩ সংখ্যায় বিভাজিত বললেও অত্যুক্তি হয় না।

প্রতি সংখ্যক অংশে চরণ ১৪টি। এটি যে একটি অভিন্ন ভাবের কেন্দ্রবিন্দুকে ধরে আবর্তিত, তা সম্পূর্ণ অংশ পাঠ করলেই বোঝা যায়। ‘পরানের গহীন ভিতর’-এর কবিতার বুনন এমনই যে তার বিষয়গত দিকের উন্মোচন কখনো কখনো
দুরূহ। ঠাসবুননে রচিত ‘পরানের গহীন ভিতর’ সৈয়দ শামসুল হকের উচ্চমার্গীয় এক সাবলীল সৃষ্টি।
কাব্যগ্রন্থটি পড়তে গেলে বিবিধ মাত্রা পাঠককে ধাঁধায় ফেলতে পারে।

পরানের গহীনে কে আছে? এর সদুত্তর একেক অংশে কখনো একই সংখ্যক কবিতায় দ্বিবিধ বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়। ফলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিষয়ের ঐক্য ভেঙে যাচ্ছে। তবে দ্বিবিধ, ত্রিবিধ কিংবা বিবিধ মাত্রার মনে হলেও সমষ্টিগত ভাবনায় মনে হবে, কবি ভাবকাঠামোয় জন্ম নেওয়া কোনো বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দুকে কেন্দ্রে রেখেই আবর্তিত হয়েছেন ৩৩টি অংশে।

‘পরানের গহীন ভিতর’-এর ৩৩টি অংশের মধ্যে যেগুলোর সন-তারিখ-স্থান কাব্যগ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে, তার ১০টি লিখেছেন ঢাকায়, পাঁচটি লিখেছেন কুড়িগ্রামে, একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চারটি কুমিল্লায়, একটি চট্টগ্রামে এবং অবশিষ্ট ১২টির সন-তারখি-স্থান উল্লেখ নেই। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সাল থেকে ২ মার্চ ১৯৭৯ সাল র্পযন্ত কালখণ্ডে লেখা এগুলো। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামে লেখা কবিতার সংখ্যাটি ১৭তম। কুড়িগ্রামে এক দিনে পাঁচটি অংশ লিখেছেন। কাব্যগ্রন্থে উল্লেখিত সেই সংখ্যাগুলো—১, ৫, ৬, ৭, ২৩। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে স্থানে বসে কবি বিষয় ও আঙ্গিকগত অংশের ধরন বজায় রেখেছেন। এখানে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে তা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের ভাষা নয়। মান বাংলার প্রাধান্যে কোনো কোনো শব্দ তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা উচ্চারণ করে পড়লে একটি ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করে। প্রায় দুই বছরে এ বইটি সম্পন্ন করেছেন। এমন হতে পারে, কবি ‘পরানের গহীন ভিতর’ রূপ এবং উপজীব্য পূর্বেই নির্বাচন করেছেন। নয়তো সবগুলো অংশ একটি কবিতার বিস্তৃত রূপ মনে হতো না।

‘পরানের গহীন ভিতর’-এর প্রথম সংখ্যক কবিতায় কবি জটিলতর বিষয় হাজির করেছেন। কবিতার শুরুতে আমরা একজন বাজিকরের সাক্ষাৎ পাই। এই বাজিকর জাদুমন্ত্র দেখিয়ে টাকা নিয়ে যায়। কবিতার মধ্যবর্তী অংশে মানুষের দোলাচল বৃত্তি নিয়ে এসেছেন। এখানে কবিতার বিষয় ক্রমাগত জটিলতার দিকে অগ্রসর হয়। এখানে কবি বলেছেন—‘নিজেই তাজ্জব তুমি—একদিকে যাইবার চাও/অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।’ এই ‘একদিকে’ এই দিকটি আসলে কোন দিক? এই দিক কি জাগতিক ও পরাজাগিতক ভাবনার আড়ালের আলাপ, নাকি ব্যক্তিগত কোনো অভিপ্রায়ের দোলাচল? ‘আরেক দিক’ থেকে কেউ একজন ভীষণ টান মারে অন্যদিকে। এই আরেক দিকে বলতে কোন দিক বোঝানো হয়েছে। ‘কেউ’ বলে চরিত্রটি এখানে পাওয়া যায় তিনি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অসীম নাকি ব্যক্তিক জীবনের নিছক কারো কথা বলা হয়েছে?

কবিতার শেষাংশের চরণগুলোতে কবিতার এ অংশের সমাপ্তি টানা হয়েছে। এখানে কবি লিখেছেন—‘খেলা যে দেখায় তার দ্যাখনের ইচ্ছায় দেখায়, ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,/সোনার মোহর তার পড়ে থাকে পথের ধুলায়।/এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর\’ কবিতার শুরুতে যে বাজিকরকে দেখতে পাই, সেই বাজিকর যে পরের বাজিকরের রূপকার্থে এসেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রকৃত অর্থে যে বাজিকরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেই বাজিকরকেও পরিষ্কার চেনা যাচ্ছে না। কারণ যে বাজিকর পরানের গহীনে রুমাল নাড়ে, তারও তো দুই অর্থ আছে। হতে পারে প্রভাবক এমন কেউ, যে জাগতিক কিংবা জাগতিকতার বাইরে। যে খেলা দেখায় সে নাকি নিজের ইচ্ছায় খেলা দেখায়। কবিতার এই বক্তব্যে আমরা লৌকিক জীবনের বাইরেও কিছু উপলব্ধি করতে পারি।

কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংখ্যক বিষয়ের ব্যাপ্তি পরবর্তী সংখ্যক কবিতা। ২ সংখ্যক কবিতায় আলো-আঁধারি বিস্তৃত। এখানেও সেই ‘কেউ’, ‘বাজিকর’, ‘একদিক’, ‘আরেক দিক’—এজাতীয় বিষয়গুলো অন্য শব্দের আড়ালে এসেছে। এখানে বলা হয়েছে—‘সোনার সংসার থুয়া পাথারের ’পরে করো বাস?/কি কামে তোমার মন লাগে না এ বাণিজ্যের হাটে?/তোমার সাক্ষাৎ পাই যেইখানে দারুণ বিরান।’ জগত্টাকে মনে হয় সোনার সংসার। জগৎ যখন টানে না, তখন কবি বলতে চেয়েছেন বাণিজ্যের হাটে মন না বসার কথা। জাগতিক সব টান ফেলে যেন বিরান পাথারে মন পড়ে থাকে।

কবিতার দুটি অংশে লৌকিকতার বাইরের এক উপলব্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করা হলো তা যেন ৪ সংখ্যক কবিতায় এসে মনুষ্য রূপ লাভ করেছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিই যেন প্রভাবক হয়ে কোথাও টানছে। প্রথম সংখ্যক কবিতায় ‘সোনার মোহর’, দ্বিতীয় সংখ্যক কবিতায় ‘সোনার সংসার’ আর ৪ সংখ্যক কবিতায় ‘সোনার মোহর’ যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে ৪ সংখ্যক কবিতায় এসে বিষয়টি ব্যক্তিগত পর্বে উন্নীত হয়। এই কবিতায় আমরা দেখি বিয়ের আগে ব্যক্তিদ্বয়ের পরস্পরের মধ্যে যে গভীর-নিবিড় সম্পর্ক ছিল, সেই সম্পর্ক ফিকে হয়ে গেছে। এ কথাই কবিতাটির চরণে ধ্বনিত হয়েছে। কবিতায় আমরা দেখতে পাই—‘মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর/নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর\’ এখানে কবিতার বিন্যাসে ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ স্থান করে নিয়েছে।

৫ সংখ্যক কবিতায় কবি একজন নিরুপায় চরিত্রকে চিত্রিত করেছেন। যার কোথাও যাওয়ার কিংবা ফেরার ঠিকানা নেই। একসময় তার ফেরার স্থান ছিল। কিন্তু সবকিছু ‘বদলায়া গ্যাছে বেবাক।’ ফলে আর ফেরা হয় না। ‘এখন যতই আমি ছড়া দেই কালিজিরা ধান,/সে কি আর আঙিনায় ফিরা আসে? আর সে কি খায়?’—এসব বলার মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, যে পাখি উড়াল দিয়ে গেছে সে আর ফিরে আসে না।

৩ এবং ৬ সংখ্যক কবিতায় অন্তরঙ্গতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ৩ সংখ্যক কবিতায় স্মৃতি এমন ব্যাধির মতো হয়ে আছে, যা কোনো দিন সেরে যাওয়ার মতো নয়। ৬ সংখ্যক কবিতায় অন্তরঙ্গতার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার ঘোষণা আছে। অনেক কবিতার বাতাবরণ হয়েছে ব্যক্তিগত অনুভূতিজাত। আবার অনেক স্থানে কিছু বিষয় উঠে এসেছে, যা ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায়। ৮ সংখ্যক কবিতায় কবি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—‘মানুষ কি জানে ক্যান মোচড়ায় মানুষের মন,/অহেতুক দুঃখ দিয়া কেউ ক্যান এতো সুখ পায়?’ ১৩ সংখ্যক কবিতায় পছন্দের মানুষের অন্যত্র বিয়ের দিনে যেরূপ ভাবনা হয়, তারই কথা বলা হয়েছে। ১৪ সংখ্যক কবিতায় কবি তত্ত্বকথা নিয়ে এসেছেন—‘কী কামে মানুষ দ্যাখে মানুষের বুকের ভিতরে/নীল এক আসমান—তার তলে যমুনার ঢল/যখন সে দ্যাখে তার পরানের গহীন শিকড়ে/এমন কঠিন টান আচানক পড়ে সে চঞ্চল?/কিসের সন্ধান করে মানুষের ভিতরে মানুষ?’

১৭ সংখ্যক কবিতায় আমরা দেখতে পাই, কবি আবারও এক রহস্যপূর্ণ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে হেঁটেছেন। এখানে কবি অন্ধকারে কারো কথা শুনতে পান। যাঁর কথা কবি শুনতে পান, তিনি শুকনা নদীর ধারে ডাক দিয়ে বলেন—‘আগো চেনা কেউ আছো কোনোখানে?’ কান্নার আওয়াজও তিনি শুনতে পান। কবি যিনি ডাকেন তাঁর সঙ্গে সব ফেলে নিরুদ্দেশ হতে চান। এখানে যিনি অন্ধকারে ডাকেন তিনি রহস্যাবৃত। তিনি কবির কোনো প্রণয়িনী বলেও মনে হয় না।

‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিচ্ছেদের আলাপন। এই বিচ্ছেদের ভাষা কখনো লৌকিকতার সীমা অতিক্রম করলেও তা শেষাবধি লৌকিক জীবনের ঘূর্ণাবর্তেই থেকে যায়। ২০ সংখ্যক কবিতায় আমরা কবির বিচ্ছেদজনিত বেদনাবোধ কিভাবে সার্বক্ষণিক হয়ে উঠেছে তা দেখতে পাই। এ কবিতায় আমরা দেখি দুঃখ ভোলার কোনো পথ নেই। কবির ভাষায়—‘দ্যাশ কি বিদ্যাশ কও, চিনা কিংবা অচিনাই হও,/দুঃখের বাদাম তোলা সেই এক নাও সব গাঙে।’/পলায়া নিস্তার কই? সবখানে সেই না শানাই।’ মানুষ কার্যত গভীর দুঃখ সারা জীবন বয়ে বেড়ায়। ‘পরানের গহীর ভিতর’ কাব্যগ্রন্থজুড়ে সেই বেদনার ছায়াপাত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থ সম্পূর্ণ পাঠে হয়ে ওঠে বিচ্ছেদের, বেদনার কাব্য। সেই বেদনামালায় কবি এঁকেছেন ৩৩টি কবিতা। কাব্যগ্রন্থটি স্বতন্ত্রলোকে উন্নীত। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সৈয়দ শামসুল হক ‘মরণসাগরপারে’ পাড়ি জমান। তাঁর প্রয়াণ স্মরণে কবির প্রতি বিনম্র প্রণতি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor