মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া হলো নারীর জীবনের এমন একটি পর্যায়, যার পর আর স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করা যায় না। সাধারণত ৫০-এর কোঠার শুরুর দিকে স্বাভাবিক মেনোপজ শুরু হলেও, ৪০ বছরের কম বয়সে হলে তাকে ‘প্রিম্যাচিউর মেনোপজ’ এবং ৪৫ বছরের কম বয়সে হলে তাকে ‘আর্লি মেনোপজ’ বলা হয়।
পরপর ১২ মাস বা এক বছর কোনো মাসিক না হলে তাকে সম্পূর্ণ মেনোপজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণত ৫৩ বছর বয়সের কাছাকাছি সময়ে স্বাভাবিক মেনোপজ হয়।
সাধারণত প্রিম্যাচিউর মেনোপজ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১ জন নারীর ক্ষেত্রে ঘটে। আর আর্লি মেনোপজ প্রতি ২০ জনে ১ জন নারীর ক্ষেত্রে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, প্রাইমারি ওভারিয়ান ইনসাফিসিয়েন্সি (পিওআই) এবং প্রিম্যাচিউর মেনোপজ এক নয়। পিওআই-এর ক্ষেত্রে অনিয়মিত মাসিক বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকতে পারে, কিন্তু প্রিম্যাচিউর বা আর্লি মেনোপজের ক্ষেত্রে মাসিক চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
লক্ষণসমূহ
প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মাসিকের নিয়মে পরিবর্তন আসা। মাসিকের চক্র ছোট বা দীর্ঘ হতে পারে, দুই মাসিকের মাঝে রক্তপাত বা স্পটিং হতে পারে কিংবা রক্তপাত কম-বেশি হতে পারে।
অন্যান্য সাধারণ লক্ষণগুলো হলো
অতিরিক্ত গরম লাগা (হট ফ্ল্যাশ) ও রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
যোনিতে শুষ্কতা ও মিলনের সময় অস্বস্তি
ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই)
ঘুমের সমস্যা ও মেজাজ পরিবর্তন
ত্বক, চোখ বা মুখ শুকিয়ে যাওয়া
যৌন চাঞ্চল্য বা লিবিডো কমে যাওয়া
মনোযোগে সমস্যা বা স্মৃতিশক্তি কিছুটা কমে যাওয়া
ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস পাওয়া
কারণ ও ঝুঁকির কারণসমূহ
ডিম্বাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন তৈরি বন্ধ হয়ে গেলে এমন হতে পারে। প্রায় অর্ধেক নারীর ক্ষেত্রেই এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায় না।
অন্যান্য কারণ
ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন
ডিম্বাশয় বা জরায়ু অপসারণের সার্জারি
ক্রোমোজোমজনিত ত্রুটি (যেমন- টার্নার সিন্ড্রোম)
অটোইমিউন রোগ (যেমন- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা থাইরয়েড রোগ)
এইচআইভি বা এইডস এবং মামসের মতো ইনফেকশন
ঝুঁকি বাড়ায় যেসব বিষয়:
১. পরিবারে মা বা বোনের অল্প বয়সে মেনোপজ হওয়ার ইতিহাস থাকলে
২. ধূমপান করার অভ্যাস থাকলে
৩. ১১ বছর বয়স হওয়ার আগেই প্রথম মাসিক শুরু হলে
জটিলতা
অল্প বয়সে মেনোপজ হলে এর লক্ষণগুলো তীব্রতর হতে পারে। এ ছাড়া শরীরে দীর্ঘদিন ইস্ট্রোজেন হরমোনের ঘাটতি থাকার কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, যেমন:
অস্টিওপোরোসিস (হাড়ের ক্ষয়)
হৃদরোগ
ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা
ডিমেনশিয়া বা পারকিনসন্স-এর মতো স্নায়ুরোগ
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
আপনার বয়স ৪৫ বছরের নিচে হলে এবং মেনোপজের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকরা কিছু পরীক্ষা ও শারীরিক অবস্থার ইতিহাস জেনে রোগ নির্ণয় করেন। এর মধ্যে রয়েছে ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন, পেলভিক আল্ট্রাসনোগ্রাফি, হরমোন লেভেলের রক্ত পরীক্ষা এবং থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট।
চিকিৎসা পদ্ধতি
হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি: মেনোপজ কেন শুরু হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ভর করে। চিকিৎসকরা সাধারণত হরমোন থেরাপির পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যা শরীরের ঘাটতি পূরণ করে এবং উপসর্গগুলো কমাতে সাহায্য করে। স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অন্যান্য সহযোগিতা: অল্প বয়সে মেনোপজ হলে উর্বরতা বা গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
গর্ভধারণ কি সম্ভব?
পরপর ১২ মাস বা এক বছর সম্পূর্ণ মাসিক বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত গর্ভধারণের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। তবে প্রিম্যাচিউর বা আর্লি মেনোপজের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ডিম্বাণু নির্গমনের কারণে গর্ভধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবুও আইভিএফ, ডোনার এগ ব্যবহার কিংবা সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
আপনার বয়স যদি ৪০ বছরের কম হয় এবং অনিয়মিত মাসিক, স্পটিং, হট ফ্ল্যাশ বা যোনি শুষ্কতার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় এই অস্বস্তিকর লক্ষণগুলো থেকে অনেকটাই স্বস্তি পাওয়া সম্ভব।
Publisher & Editor