ছবি: সংগৃহীত
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো চার হাজার ৪৬২ জন নিখোঁজ রয়েছে।
বুধবার নেপাল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। নেপালে মর্গে মরদেহ রাখার জায়গা না থাকায় অনেক মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর শত শত অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ দাফন করতে হয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অনেক পরিবার আশা ছেড়ে দিয়েছে।
তারা নিখোঁজ স্বজনদের স্মরণে প্রতীকী শেষকৃত্য শুরু করেছে। তবে উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলে বিদেশি সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের ওপর নানা ধরনের বিধি-নিষেধ রয়েছে। ওই অঞ্চল থেকে তথ্য প্রকাশের ওপরও চীনা কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
প্রবাসী তিব্বতি অধিকারকর্মীরা দুর্যোগের বিষয়ে চীনের দেওয়া তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে বেইজিংয়ের দাবি, তারা দুর্যোগের তথ্য ‘খোলামেলা, স্বচ্ছ ও সময়মতো’ প্রকাশ করেছে। এদিকে নেপাল ও চীনে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কাজ এখনো চলছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর আরো মরদেহ পাওয়া যেতে পারে। দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারলে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
তবে কিছু দুর্গত এলাকায় যোগাযোগ ও প্রবেশে বাধা থাকায় সেখানে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা এখনো কঠিন। উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় পরিস্থিতির পুরো চিত্র পেতে সময় লাগতে পারে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২৬ আগস্ট হিমালয়ের উচ্চ এলাকায় হিমবাহ ধসের পর এই দুর্যোগ শুরু হয়। এতে বরফগলা পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নিচের দিকে নেমে আসে। নেপালে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটিতে আরো ৩ হাজার ৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছে।
চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এ হিসাবে নেপাল ও তিব্বতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬ জন এবং নিখোঁজ ৪ হাজার ৪৬২ জন। এদিকে ভারতের ভাটির দিকের নদীগুলো থেকেও অন্তত ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে কয়েক দিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্র ও মর্গে ঘুরছেন অনেক পরিবারের সদস্য। কিন্তু কোনো সন্ধান না পাওয়ায় কেউ কেউ এখন প্রতীকী শেষকৃত্য করছেন। দোলমা নেওয়ার তামাংয়ের স্বামী দুর্যোগের সময় চীনের দিকে যাচ্ছিলেন। এর পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, স্বামীর আত্মার শান্তির জন্যই তারা প্রতীকী শেষকৃত্য করেছেন। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পর স্বামীকে ফোন করেছিলেন। বারবার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি। উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো জীবিতদের খুঁজছে। বিশেষ করে ওই এলাকার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর টানেলগুলোতে কেউ আটকে থাকতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত কাদায় আটকে থাকা কয়েকটি টানেল থেকে শুধু মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার পরও উদ্ধারকারীরা হাল ছাড়েননি। তারা ধ্বংসস্তূপ সরাতে খনন ও ড্রিলিংয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনে বিস্ফোরণ ব্যবহার করছেন। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, অলৌকিক ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই এখনই তিনি পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিতে চান না। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক দায়িত্ব
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, এই ভয়াবহ দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি বাড়ার একটি বড় সতর্কবার্তা। ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সারা বিশ্বে পড়ছে। তাই দুর্যোগ মোকাবেলার দায়িত্বও শুধু একটি দেশের নয়, পুরো বিশ্বের।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার কারণে হিমালয় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং পাহাড়ি এলাকায় বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, হিমালয় ও হিন্দুকুশ পর্বতমালার হিমবাহ কোটি কোটি মানুষের পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ২৪ কোটি মানুষ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদী অববাহিকায় আরো প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এসব পানির ওপর নির্ভরশীল।
প্রায় ৩ কোটি মানুষের দেশ নেপালে এই দুর্যোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের ভূমিকা খুবই কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল অন্যতম।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠনে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে। দেশটির অর্থনীতি এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই এত বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালের নিজস্ব অর্থ ও সম্পদ সীমিত। এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি তিব্বতের জিরং বন্দরে সড়ক যোগাযোগ আবার চালু হয়েছে। কয়েক দিন ধরে টানা মেরামত কাজ চালানোর পর বুধবার ওই এলাকার সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করা হয়।
Publisher & Editor